বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে প্রাচীন ঐতিহ্যের হাজারো নিদর্শন। তেমনি এক বিস্ময়কর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় সগৌরবে টিকে আছে প্রায় ১২শ বছরের পুরনো ‘ওয়াদ্দার দিঘি’। এই দিঘিটি কেবল একটি জলাশয় নয়, এটি পাল রাজবংশ থেকে শুরু করে আধুনিক ইসলামী ঐতিহ্যের এক দীর্ঘ পথপরিক্রমার নাম। ৩২ বিঘা আয়তনের এই দিঘিটি আজ কেবল শ্রীপুরের নয়, বরং পুরো গাজীপুর জেলার এক অমূল্য সম্পদ।

পাল রাজবংশের পদচিহ্ন: রাজা ইন্দ্রপাল ও আদিত্যপাল

ইতিহাসবিদদের মতে, অষ্টম শতাব্দীতে পাল রাজবংশের প্রতাপশালী রাজা ইন্দ্রপাল ‘ইন্দ্রপুর’ ও তার পার্শ্ববর্তী বিশাল অঞ্চল নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য গঠন করেছিলেন। বর্তমান শ্রীপুর ছিল সেই প্রাচীন রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র। রাজা ইন্দ্রপালের সুযোগ্য পুত্র আদিত্যপাল শ্রীপুর সদর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার উত্তরে একটি বিশালাকার সেনা ছাউনি বা সেনানিবাস স্থাপন করেন।

সেই সময় কয়েক হাজার সৈন্য এবং ঘোড়াশালের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য পানির উৎস ছিল না। রাজপুত্র আদিত্যপালের নির্দেশে তখন রাস্তার পাশে প্রায় ৩২ বিঘা জমির ওপর বিশাল এই দিঘিটি খনন করা হয়। আদিত্যপালের নামানুসারেই এককালে এটি ‘আদিত্যপালের দিঘি’ নামে পরিচিত ছিল। পাল বংশের পতনের পর তাদের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী রানী ভবানী পাল এই অঞ্চলটি শাসন করতেন এবং তিনিও এই দিঘিটিকে আগলে রেখেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

স্থানের নাম ওয়াদ্দার দিঘি (পূর্বনাম: আদিত্যপালের দিঘি)
সময়কাল অষ্টম শতাব্দী (পাল আমল)
খননকারী রাজপুত্র আদিত্যপাল (রাজা ইন্দ্রপালের পুত্র)
আয়তন ৩২ বিঘা
অবস্থান শ্রীপুর, গাজীপুর

শ্রীপুর ও গাজীপুর নামকরণের গভীর যোগসূত্র

ওয়াদ্দার দিঘির ইতিহাসের সাথে শ্রীপুর ও গাজীপুর নামকরণের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস অনুযায়ী, রাজা ইন্দ্রপালের পুত্র রাজা শ্রীপালের নাম অনুসারে এই এলাকার নামকরণ করা হয়েছিল ‘শ্রীপুর’। সংস্কৃত ‘শ্রী’ শব্দের অর্থ সৌন্দর্য এবং ‘পুর’ অর্থ নগরী। অর্থাৎ শ্রীপুর মানেই হচ্ছে সৌন্দর্যের নগরী। ১২০০ বছর আগে এই অঞ্চলটি যে অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং দৃষ্টিনন্দন ছিল, তার প্রমাণ মেলে এই নামকরণে।

পরবর্তীতে পাল ও সেন শাসনের পর শুরু হয় ফকির-দরবেশদের আধিপত্য। দিল্লি থেকে ইসলাম প্রচারের মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই অঞ্চলে আসেন বীর যোদ্ধা ও সুফি সাধক পাহলোয়ান শাহ গাজী। তার বংশের গৌরবময় নামানুসারেই আজকের ‘গাজীপুর’ জেলার নামকরণ করা হয়েছে। শাহ পাহলোয়ান গাজীকে দিল্লির তৎকালীন বাদশাহ এই অঞ্চল শাসনের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পাহলোয়ান শাহ ও তার অনুসারীরা এই ওয়াদ্দার দিঘির পাড়েই আস্তানা গেড়েছিলেন এবং দিঘির পানি ব্যবহার করতেন।

ওয়াদ্দার দিঘি: ব্রিটিশ আমল ও নামকরণের বিবর্তন

পাল আমলের ‘আদিত্যপালের দিঘি’ কীভাবে ‘ওয়াদ্দার দিঘি’ হলো, তা নিয়েও রয়েছে কৌতুহলোদ্দীপক ইতিহাস। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন জমিদারি প্রথা প্রবল ছিল, তখন এক প্রভাবশালী ও দানশীল মুসলমান ব্যক্তি এই দিঘিটি সরকারের কাছ থেকে পত্তন বা লিজ নেন। স্থানীয় জনগণের কাছে তিনি ‘ওয়াদ্দার’ (তৎকালীন একটি উপাধি বা পদবি) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সেই সময় থেকেই এই দিঘিটির নাম পাল্টে লোকমুখে ‘ওয়াদ্দার দিঘি’ হিসেবে স্থায়ী পরিচিতি পায়।

উপজেলার সর্ববৃহৎ ঈদগাহ মাঠ ও ধর্মীয় গুরুত্ব

ওয়াদ্দার দিঘির পূর্বপাশে অবস্থিত বিশাল খোলা মাঠটি আজ শ্রীপুরের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু। প্রতি বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে এখানে অনুষ্ঠিত হয় শ্রীপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে পুরো মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে।

বর্তমান চিত্র: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

বর্তমানে এই দিঘির পশ্চিম পাড়ে অনেক ভূমিহীন পরিবার বসবাস করছে। এই পরিবারগুলো যেন দিঘিটির অদৃশ্য অভিভাবক। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও সচেতনতায় দিঘির পানি আজও দূষণমুক্ত ও টলমল। আধুনিক পর্যটনের ছোঁয়াও লেগেছে এখানে। দিঘির পাড়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক রিসোর্ট এবং কফিশপ, যেখানে প্রতিদিন বিকেলে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় থাকে।

পর্যটকদের জন্য: আপনি যদি ইতিহাসের সন্ধানে বের হতে চান, তবে একদিনের সফরে ওয়াদ্দার দিঘি সেরা গন্তব্য। এখানে একদিকে যেমন ১২০০ বছরের প্রাচীন দিঘি দেখতে পাবেন, তেমনি বিশাল ঈদগাহ মাঠের প্রশান্তি অনুভব করবেন। বিকেলে রিসোর্টের কফিশপে বসে দিঘির শান্ত পানির দৃশ্য আপনার মন ভরিয়ে দেবে।

সংরক্ষণ ও পর্যটন সম্ভাবনা

ওয়াদ্দার দিঘি কেবল একটি দিঘি নয়, এটি শ্রীপুরের আভিজাত্য এবং ১২০০ বছরের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তবে ঐতিহাসিক এই স্থানটির প্রাচীন রূপ ধরে রাখতে এবং আরও দর্শনার্থী আকর্ষণ করতে সরকারি পর্যায়ে আরও উন্নয়নমূলক কাজ প্রয়োজন। সঠিকভাবে খনন ও সৌন্দর্যবর্ধন করা হলে এটি হতে পারে ঢাকা বিভাগের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র। প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন এই সৌন্দর্যের নগরীর ইতিহাস জানতে পারে, সেই লক্ষ্যে আমাদের এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা একান্ত কর্তব্য।