
বাংলাদেশের মানচিত্রে গাজীপুর জেলা শিল্পায়নের জন্য পরিচিত হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সবুজের সমারোহ এবং অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন। বিশেষ করে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, শালবন, নদী এবং আধুনিক রিসোর্টের এক অপূর্ব মিলনস্থল। আপনি যদি ঢাকা বা এর আশেপাশের এলাকা থেকে একদিনের ট্যুর বা সপ্তাহান্তের ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে শ্রীপুর আপনার জন্য সেরা গন্তব্য হতে পারে।
আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আমরা শ্রীপুর উপজেলার এমন ২৭টি দর্শনীয় স্থান নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনার ভ্রমণকে আনন্দময় এবং জ্ঞানগর্ভ করে তুলবে।
বিনোদন কেন্দ্র ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য (Nature & Parks)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক
শ্রীপুরের বাঘের বাজার এলাকায় অবস্থিত এই পার্কটি এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সাফারি পার্ক। এখানে বন্যপ্রাণীরা উন্মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে এবং পর্যটকরা সুরক্ষিত গাড়িতে থেকে সেগুলো দেখতে পান। বাঘ, সিংহ, ভাল্লুক এবং ক্যাঙ্গারুসহ অসংখ্য বিরল প্রজাতির পশুপাখি এখানে রয়েছে। বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতি মঙ্গলবার এটি বন্ধ থাকে। আরো জানুন
সাতখামাইর ইকো পার্ক
বরমী-মাওনা রোডের পাশেই অবস্থিত এই ইকো পার্কটি মূলত গজারী বনের গভীর ছায়ায় ঘেরা। যারা যান্ত্রিকতা থেকে দূরে গিয়ে নির্জনে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এটি চমৎকার একটি জায়গা। এখানকার উঁচু-নিচু টিলা আর বনের নিস্তব্ধতা মন ভালো করে দেয়।
পাগলার বান বা পাগলার ব্রিজ
গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত ‘পাগলার ব্রিজ’ বর্ষাকালে বিশাল জলরাশি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে স্থানীয়দের কাছে একটি জনপ্রিয় বিনোদন ও মিনি পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এখানকার নদীর স্বচ্ছ পানি আর শান্ত পরিবেশ নৌকা ভ্রমণের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই স্থানের রূপ বহুগুণ বেড়ে যায়। আরো জানুন
ফ্রেন্ডস ফ্যামিলি পার্ক
শ্রীপুরের প্রহলাদপুর এলাকায় অবস্থিত এই পার্কটি মূলত পারিবারিক বিনোদনের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে। শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড এবং বড়দের জন্য বসার সুব্যবস্থা থাকায় এটি স্থানীয়দের কাছে খুব জনপ্রিয়।
শিশুপল্লী প্লাস (Sishupolly Plus)
তেলিহাটি ইউনিয়নে অবস্থিত এটি একটি আন্তর্জাতিক এনজিও ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। এর সুশৃঙ্খল পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন ক্যাম্পাস এবং মানবিক কার্যক্রম পর্যটকদের মুগ্ধ করে। এটি মূলত সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও মায়েদের আশ্রয়ের জন্য পরিচিত।
বৃন্দাবন (শুটিং স্পট)
তেলিহাটি ইউনিয়নের একটি ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় স্থান হলো বৃন্দাবন। এর বিশাল শালবন এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে এখানে নিয়মিত নাটক ও সিনেমার শুটিং হয়। এটি পিকনিক করার জন্য একটি আদর্শ ও নিরাপদ এলাকা।
কানন পিকনিক স্পট
তেলিহাটী ইউনিয়নের শালবনের ভেতরে অবস্থিত এই স্পটটি একটি মনোরম প্রাকৃতিক বনভোজন কেন্দ্র। আপনি যদি বড় গ্রুপ নিয়ে পিকনিক করতে চান, তবে এখানকার ছায়াঘেরা পরিবেশ আপনার পছন্দ হবেই।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ববহ স্থান (History & Religion)
ওয়াদ্দার দিঘী
শ্রীপুর সদরের ঠিক উত্তর পাশে অবস্থিত এই বিশাল প্রাচীন দিঘীটি অত্র অঞ্চলের ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী। দিঘীর পাড়ে বসে পড়ন্ত বিকেলের হাওয়া উপভোগ করা যায়। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি অত্যন্ত পরিচিত একটি ল্যান্ডমার্ক। আরো জানুন
অতুল প্রসাদ কাওরাইদ বাংলো
বিখ্যাত সংগীত সাধক অতুল প্রসাদ সেনের স্মৃতিবিজড়িত এই বাংলোটি কাওরাইদ রেল স্টেশনের কাছে অবস্থিত। যারা ইতিহাস এবং সংগীত ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি একটি তীর্থস্থান। এখানে অতুল প্রসাদের জীবনের নানা স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
হাজি আব্দুস সাত্তার মসজিদ
ভাঙনাহাটী (আনসার রোড) এলাকায় অবস্থিত এই মসজিদটি বর্তমানে শ্রীপুরের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য। এর গম্বুজ এবং নকশা আধুনিক ও ইসলামিক শিল্পের এক দারুণ মিশ্রণ। ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ছাড়াও দর্শনার্থীরা এর সৌন্দর্য দেখতে ভিড় করেন। আরো জানুন
শ্রীপুর মডেল মসজিদ
উপজেলা সদরে অবস্থিত নবনির্মিত এই মডেল মসজিদটি আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য উদাহরণ। সরকারি উদ্যোগে নির্মিত এই মসজিদটি যেমন বিশাল, তেমনি এর অভ্যন্তরীণ সজ্জাও অত্যন্ত সুন্দর।
সাতখামাইর বদ্ধভূমি
মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি সাতখামাইর রেল স্টেশনের কাছে অবস্থিত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার সাক্ষী এই জায়গাটি আমাদের স্বাধীনতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।
কর্ণপুর দিঘী
গোসিংগা ইউনিয়নের কর্ণপুর গ্রামে অবস্থিত এই প্রাচীন দিঘীটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। বিশাল এই জলাশয় এবং এর চারপাশের শান্ত পরিবেশ আপনাকে সতেজ করে তুলবে।
আদর্শ গ্রাম বৈরাগীর চালা
শ্রীপুর পৌরসভায় অবস্থিত আদর্শ গ্রাম বৈরাগী চালা। যেখানে ব্রিটেনের রানী এসেছিলেন। এই গ্রামে এখনো একটি হ্যালিপ্যাড রয়েছে।
স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও গ্রামীণ জীবন (Culture & Infrastructure)
বরামা সেতু ও শীতলক্ষ্যা নদী
শ্রীপুরের বরামা এবং কাপাসিয়ার সিংহশ্রী এলাকার সংযোগস্থলে নির্মিত এই ব্রিজটি বিকেলের আড্ডার জন্য সেরা। ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর নির্মল বাতাস এবং চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করা যায়।
ত্রমোহনী সেতু
বরমী ও গফরগাঁও এর পাগলা এলাকার মিলনস্থলে অবস্থিত এই সেতুটি যাতায়াতের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি পর্যটনের জন্যও দারুণ। নদী সড়কের এক অদ্ভুত সৌন্দর্য এখান থেকে লক্ষ্য করা যায়।
শ্রীপুর কাঁঠালের ভাস্কর্য
গাজীপুরের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্য হলো কাঁঠাল। শ্রীপুর চৌরাস্তার উপজেলা চত্বরে অবস্থিত কাঁঠালের এই ভাস্কর্যটি জেলার পরিচায়ক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এটি পর্যটকদের কাছে একটি প্রিয় ফটোগ্রাফি পয়েন্ট।
কেওয়া বটগাছ
কেওয়া এলাকায় অবস্থিত এই শতবর্ষী বিশাল বটগাছটি বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের প্রতীক। এর বিশাল ঝুড়ি এবং ছায়া মানুষকে এক নিমিষেই গ্রামবাংলার আদি যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
বরমী বাজার ও নদী পাড়
শত বছরের পুরনো বরমী বাজার তার ঐতিহ্যবাহী নৌ-ঘাট এবং শীতলক্ষ্যা নদীর জন্য পরিচিত। এখানকার মিষ্টান্ন এবং নদীর মাছ অত্যন্ত সুস্বাদু। নদী পাড়ে ভ্রমণের জন্য এটি একটি সেরা জায়গা।
গোসিংগা খেয়াঘাটপাড়
শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে অবস্থিত এই ঘাটটি শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশের জন্য পরিচিত। যারা একটু নিরিবিলি নদীর ধারে বসে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য গোসিংগা খেয়াঘাট হতে পারে উপযুক্ত পছন্দ।
বনখড়িয়া ক্যান্ট্যানমেন্ট রোড
বনখড়িয়া এলাকার এই রাস্তাটি অত্যন্ত সুন্দর এবং দুই পাশে বনাঞ্চল থাকায় এটি ড্রাইভ করার জন্য বা বাইক রাইডিংয়ের জন্য দারুণ। এখানকার পিচঢালা পথ আর সবুজের মায়া ভ্রমণপিপাসুদের টানে।
বরমী ও কর্ণপুর রোড রোড
বরমী ও গোসিংগা এলাকার এই রাস্তাটি অত্যন্ত সুন্দর এবং দুই পাশে বনাঞ্চল থাকায় এটি ড্রাইভ করার জন্য বা বাইক রাইডিংয়ের জন্য দারুণ। এখানকার পিচঢালা পথ আর সবুজের মায়া ভ্রমণপিপাসুদের টানে। বিশেষ করে বসন্তের পরে এখানে দারুণ ভালো লাগে।
আধুনিক রিসোর্ট ও লাক্সারি লিভিং (Resorts)
নক্ষত্রবাড়ি রিসোর্ট
রাজাবাড়ি এলাকায় অবস্থিত অভিনেতা ও নির্মাতা তৌকির আহমেদের এই রিসোর্টটি বিলাসিতা এবং প্রকৃতির এক দারুণ সমন্বয়। এখানে জলের ওপর কাঠের বাংলো পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে।
গ্রিন ভিউ গলফ রিসোর্ট
মাওনা উত্তর পাড়া (আনসার রোড) এলাকায় অবস্থিত এই রিসোর্টটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা এবং গলফ খেলার মাঠের জন্য পরিচিত। কর্পোরেট ট্যুর বা পারিবারিক ছুটির জন্য এটি একটি চমৎকার জায়গা।
মাটির মায়া ইকো রিসোর্ট
জৈনা বাজারের কাছে উদয়খালি রোডে অবস্থিত এই রিসোর্টটি মাটির ঘর এবং গ্রামীণ আবহে সাজানো হয়েছে। কৃত্রিমতার ভিড়ে মাটির সুবাস পেতে চাইলে এখানে অবশ্যই আসতে হবে।
সবুজ পাতা রিসোর্ট
মাওনা এলাকায় অবস্থিত এই রিসোর্টটি নিরিবিলি এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য পরিচিত। এখানে শিশুদের জন্য খেলার জায়গা এবং সুইমিং পুলের ব্যবস্থা রয়েছে।
কালমেঘ ভিলা ও কান্ট্রি ক্লাব
শ্রীপুরের কালমেঘ এলাকায় অবস্থিত এই লাক্সারি ভিলাটি আভিজাত্যের প্রতীক। এর রাজকীয় পরিবেশ এবং আধুনিক ইন্টেরিয়র আপনাকে মুগ্ধ করবে।
সিসিডিবি (CCDB) লার্নিং সেন্টার
জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক লার্নিং সেন্টার ও পার্ক। এটি মূলত জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে কাজ করলেও এর ক্যাম্পাসটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো, যা দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।
এছাড়াও রয়েছে স্থানীয় অনেক ঐতিহাসিক গ্রামীণ বাজার, রেলওয়ে স্টেশন ও বাজারঘাট যা শ্রীপুরের ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তোলে।
দূর থেকে কিভাবে আসবেন শ্রীপুরে?
ঢাকা থেকে শ্রীপুরে আসা খুবই সহজ। আপনি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাসে (যেমন: এনা, সৌখিন, আলম এশিয়া) মাওনা চৌরাস্তায় নামতে পারেন। মাওনা চৌরাস্তা থেকে অটোরিকশা বা সিএনজি দিয়ে উপরের সবকটি স্থানে পৌঁছানো সম্ভব। এছাড়া কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেল স্টেশন থেকে ট্রেনে করে শ্রীপুর বা সাতখামাইর স্টেশনে নেমেও ভ্রমণ শুরু করা যায়।
ভ্রমণের টিপস
- সাফারি পার্ক ভ্রমণে মঙ্গলবার এড়িয়ে চলুন।
- বনাঞ্চলে ভ্রমণের সময় পরিবেশের ক্ষতি করবেন না এবং প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলবেন না।
- রিসোর্টগুলোতে যাওয়ার আগে অগ্রিম বুকিং দিয়ে নেওয়া ভালো।
- শালবনের ভেতরে একা খুব গভীরে না যাওয়াই নিরাপদ।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলা যেন প্রকৃতির এক বিশাল ক্যানভাস। আপনি ইতিহাস খুঁজছেন কিংবা স্রেফ রিফ্রেশমেন্ট—এই ২৭টি স্থান আপনার সব চাহিদাই পূরণ করবে। আজই আপনার ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন শ্রীপুরের উদ্দেশ্যে!
আপনার জানামতে গাজীপুরের শ্রীপুরে ভ্রমণ করার মত আরো কোন স্থান থাকলে এখানে কমেন্ট এ জানিয়ে দিন।