
গাজীপুরের পিরুজালীতে প্রকৃতির বিস্ময়কর ‘জয়না গাছ’
প্রকৃতি সবসময়ই তার আপন খেয়ালে রূপ পরিবর্তন করে মানুষকে মুগ্ধ করে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের এক অনন্য নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের সেই শতবর্ষী ‘জয়না গাছ’। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘কুসুম গাছ’ হিসেবেও পরিচিত। বসন্তের আগমনে এই গাছটি যখন তার পুরনো পাতা ঝরিয়ে নতুন কচি পাতায় ভরে ওঠে, তখন পুরো এলাকা এক মায়াবী লাল রঙে ছেয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন বিশাল এক লাল গালিচা বিছিয়ে রাখা হয়েছে আকাশের নিচে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও পর্যটকদের ভিড়ে এই গাছটি কেবল একটি উদ্ভিদ নয়, বরং একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
জয়না বা কুসুম গাছের পরিচয়: উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এই গাছটি ‘কুসুম’ (Schleichera oleosa) নামে পরিচিত হলেও গাজীপুর ও এর আশেপাশের অঞ্চলে এটি ‘জয়না গাছ’ নামে সমধিক পরিচিত। এটি একটি পর্ণমোচী বা পত্রঝরা বৃক্ষ। একটা সময় ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বনাঞ্চলে এই গাছ প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত। তবে নগরায়ণ ও বনভূমি উজাড় হওয়ার কারণে বর্তমানে এটি বাংলাদেশে একটি বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ হিসেবে গণ্য হয়। গাজীপুরের পিরুজালী ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া গ্রামে টিকে থাকা এই বিশাল গাছটি সেই হারানো ঐতিহ্যেরই এক জীবন্ত সাক্ষী।
ঋতুভেদে জাদুকরী রূপান্তর: এই গাছের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর রঙের খেলা। শীতের শেষে যখন প্রকৃতিতে বসন্তের হাওয়া লাগে, তখন জয়না গাছটি তার পুরনো সব সবুজ পাতা ঝরিয়ে ফেলে একদম কঙ্কালসার হয়ে যায়। কিন্তু ফাল্গুন-চৈত্র মাসে যখন নতুন পাতা গজাতে শুরু করে, তখন শুরু হয় এক জাদুকরী রূপান্তর। কচি পাতাগুলো টকটকে লাল বা তামাটে লাল রঙের হয়। এই সময় গাছটিকে দেখলে মনে হয় যেন কোনো শিল্পী তার তুলি দিয়ে রক্তজবা ফুলের রঙ ঢেলে দিয়েছেন পুরো গাছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই লাল রূপটি স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক সপ্তাহ। কচি পাতাগুলো যখন একটু বড় হতে থাকে, তখন ধীরে ধীরে লাল আভা ফিকে হয়ে আসে এবং গাছটি গাঢ় সবুজ রঙ ধারণ করে। প্রকৃতির এই ক্ষণস্থায়ী কিন্তু তীব্র সৌন্দর্য দেখার জন্যই প্রতিবছর বসন্তকালে হাজারো মানুষ এখানে ভিড় জমায়।
অবস্থান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ: গাছটি গাজীপুর জেলার সদর উপজেলার পিরুজালী ইউনিয়নের মাস্টারপাড়া বা ভেরামতলী গ্রামে অবস্থিত। এর ভৌগোলিক অবস্থানটিও বেশ চমৎকার। গাছটির ঠিক পাশ দিয়েই বয়ে গেছে শান্ত-স্নিগ্ধ ‘সালদহ নদী’। নদীর শীতল বাতাস আর জয়না গাছের লাল পাতার মিতালি এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করে। গাছের তিন দিকে দিগন্তজোড়া ফসলি জমি আর একদিকে নদীর কলতান পর্যটকদের মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। এছাড়া জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নন্দনকানন ‘নুহাশ পল্লী’ এখান থেকে মাত্র ১-২ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় পর্যটকরা একই ভ্রমণে দুটি জায়গা দেখার সুযোগ পান।
ঔষধি ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব: জয়না গাছ কেবল সৌন্দর্যের আধার নয়, এর রয়েছে বহুমুখী ঔষধি ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামবাংলার কবিরাজি চিকিৎসায় এই গাছের ব্যবহার অনস্বীকার্য:
- ১. কুসুম তৈল: এই গাছের বীজ থেকে এক বিশেষ ধরনের তেল নিষ্কাশন করা হয়, যা ‘কুসুম তেল’ নামে পরিচিত। এটি চর্মরোগ নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকর।
- ২. হজম ও কফ নাশক: এর ফল খেতে টক-মিষ্টি স্বাদের। এই ফল হজমশক্তি বাড়াতে এবং অরুচি দূর করতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি কফ নাশক হিসেবেও কাজ করে।
- ৩. বাতের ব্যথা: গাছের ছাল সেদ্ধ করে বা বেটে প্রলেপ দিলে বাতের ব্যথায় আরাম পাওয়া যায় বলে লোকজ চিকিৎসায় প্রচলিত আছে।
- ৪. পশুখাদ্য ও কাঠ: গাছের পাতা গবাদি পশুর উন্নত মানের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এর কাঠ বেশ শক্ত ও টেকসই হয়, যা কৃষি সরঞ্জাম তৈরিতে কাজে লাগে।
পর্যটনের নতুন দিগন্ত: গত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই জয়না গাছটি দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শৌখিন আলোকচিত্রীদের কাছে এটি একটি পছন্দের গন্তব্য। বসন্তের বিকেলে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে লাল পাতার ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি তোলার হিড়িক পড়ে যায়। স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন কয়েক শ পর্যটক এই গাছটি দেখতে আসেন। পর্যটনের এই প্রসার স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ছোট ছোট দোকান ও খাবারের হোটেল গড়ে উঠছে যা গ্রামটির জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনছে।
কিভাবে যাবেন: রাজধানী ঢাকা বা দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে সহজেই এখানে আসা সম্ভব:
-
রুট ১: ঢাকা থেকে বাসে করে গাজীপুর চৌরাস্তা হয়ে হোতাপাড়া অথবা ভবানীপুর বাসস্ট্যান্ডে নামতে হবে। সেখান থেকে অটো বা ইজিবাইক যোগে সরাসরি পিরুজালী গ্রামের পশ্চিম দিকে গেলেই দেখা মিলবে এই বিখ্যাত গাছের।
-
রুট ২: শ্রীপুর বা মাওনা থেকে আসতে চাইলে বারতোপা বাজার হয়ে পিরুজালী গ্রামে প্রবেশ করা যায়।
সংরক্ষণ ও পরিবেশ সচেতনতা: এই বিরল প্রজাতির গাছটি আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। পর্যটকদের ভিড় বাড়ার সাথে সাথে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও বাড়ছে। চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বোতল বা ময়লা ফেলে যেন এই মনোরম পরিবেশ নষ্ট না হয়, সেদিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত এই শতবর্ষী গাছটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা এবং এর চারপাশের পরিবেশকে পর্যটনবান্ধব করার পাশাপাশি প্রকৃতিকেও রক্ষা করা।
গাজীপুরের জয়না গাছ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি তার অবারিত সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের চারপাশেই আছে, শুধু আমাদের দেখার চোখ থাকতে হয়। বসন্তের সেই রক্তিম আভা আর সালদহ নদীর স্নিগ্ধতা জয়না গাছকে দিয়েছে এক অনন্য মাহাত্ম্য। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে এবং প্রকৃতির খুব কাছাকাছি কিছু সময় কাটাতে পিরুজালীর এই জয়না গাছ হতে পারে এক চমৎকার গন্তব্য। প্রকৃতির এই লাল স্বর্গকে রক্ষা করা এবং এর সৌন্দর্য উপভোগ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
[…] আরো দেখুনঃ আলোচিত জয়না গাছ। […]