
বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক অনন্য আধার হলো গ্রামীণ মেলা। নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা ছাপিয়ে শেকড়ের টানে মানুষকে একত্রিত করার এই চিরায়ত রীতি আজও টিকে আছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সিংহশ্রী ইউনিয়নে। গত ০৭ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি. মঙ্গলবার, এই ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী ‘উদুই পুকুর পাড়ে’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শত বছরের পুরনো এক জমজমাট মেলা। দীর্ঘ বিরতির পর এই মেলার আয়োজন গ্রামবাংলার হারানো ঐতিহ্যকে যেন নতুন করে প্রাণদান করেছে।
শত বছরের ঐতিহ্য ও কালের বিবর্তন
সিংহশ্রী ইউনিয়নের উদুই পুকুর পাড়ের এই মেলাটি কোনো সাধারণ আয়োজন নয়, বরং এটি ওই অঞ্চলের মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের প্রতীক। ইতিহাস অনুযায়ী, গত এক শতাব্দী ধরে প্রতি বছর বাংলা চৈত্র মাসের শেষ মঙ্গলবার এই মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। গ্রামের প্রবীণদের মতে, এক সময় এই মেলা এতটাই বিশাল হতো যে, দীঘির মতো বড় এই পুকুরের চারপাশের কানায় কানায় মানুষ পূর্ণ থাকতো, তিল ধারণের জায়গা পাওয়া যেত না।
তবে বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে গত ৫-৬ বছর মেলাটি বন্ধ ছিল। ফলে এলাকার মানুষের মনে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছিল। এ বছর গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগে মেলাটি পুনরায় চালু করা হয়েছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।
মেলার আকর্ষণ: গ্রামীণ পণ্য ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতা
গ্রামীণ মেলার প্রাণ হলো স্থানীয় কুটির শিল্প এবং হরেক রকমের দেশীয় পণ্য। উদুই পুকুর পাড়ের এই মেলায় দেখা গেছে মাটির তৈরি খেলনা, তৈজসপত্র, বাঁশ ও বেতের তৈরি গৃহস্থালি সামগ্রী এবং রকমারি মিষ্টি ও খাবারের দোকান। বিশেষ করে শিশুদের জন্য কাঠের চাকা লাগানো গাড়ি এবং মাটির ব্যাংক ছিল অন্যতম আকর্ষণ।
অতীতের মেলাগুলোতে বিনোদনের জন্য থাকতো ঘোড় দৌড় প্রতিযোগিতা, যা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসতো। এছাড়া পুকুর থেকে হাঁস ধরার প্রতিযোগিতা এবং গ্রামীণ শক্তির লড়াই ‘কাছিটান’ ছিল মেলার প্রধান আকর্ষণ। যদিও আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কিছু কিছু প্রতিযোগিতা আগের জৌলুস হারিয়েছে, তবুও এ বছর গ্রামবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, শেকড়ের টানে মানুষ আজও এসব উৎসবকে ভালোবাসে।
নতুন সিদ্ধান্ত: আগামী বছর থেকে দুই দিনব্যাপী উৎসব
এবারের মেলার সফল আয়োজনের পর আয়োজক ও গ্রামবাসী একটি বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। মেলাটির জনপ্রিয়তা এবং মানুষের সমাগম বিবেচনা করে আগামী বছর থেকে এটি দুই দিনব্যাপী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এখন থেকে চৈত্র মাসের শেষ মঙ্গলবার এবং বুধবার—টানা দুই দিন ধরে চলবে এই গ্রামীণ মেলা। এই সিদ্ধান্ত মেলাটিকে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করবে।
আসছে ‘বৈশাখী মেলা বাজার’: দর্শকদের জন্য সুখবর
যারা সময়ের অভাবে ০৭ এপ্রিলের মেলাটি উপভোগ করতে পারেননি, তাদের জন্য রয়েছে আরও একটি রোমাঞ্চকর খবর। আগামী শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে সিংহশ্রী বাজারে আয়োজন করা হয়েছে ‘বৈশাখী মেলা বাজার’। উদুই পুকুর পাড়ের আমেজ কাটতে না কাটতেই এই নতুন মেলাটি এলাকার মানুষের মাঝে আনন্দের নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বৈশাখী মেলা বাজারের বিশেষ আকর্ষণ: সিংহশ্রী বাজারের এই মেলাটি হবে আরও বৈচিত্র্যময়। এখানে গ্রামীণ সংস্কৃতির পাশাপাশি কিছু আধুনিক রোমাঞ্চের ছোঁয়াও থাকবে:
-
বাউল গান: বাংলার আধ্যাত্মিক এবং লোকজ ঐতিহ্যের ধারক বাউল শিল্পীগণ তাদের গান দিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ মুখরিত করবেন।
-
ঘোড় দৌড়: প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী খেলাটি দর্শকদের দারুণ আনন্দ দেবে।
-
কাছিটান: দুই গ্রামের বা দুই পাড়ার শক্তির পরীক্ষা দেখতে ভিড় জমাবেন হাজারো মানুষ।
-
মোটরসাইকেল দৌড়: এবারের মেলার বিশেষ এবং আধুনিক আকর্ষণ হলো দ্রুতগতির মোটরসাইকেল দৌড় প্রতিযোগিতা, যা তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের জন্য হবে প্রধান উত্তেজনা।
পর্যটন ও ডিজিটাল কন্টেন্ট তৈরির সম্ভাবনা
গাজীপুর ও এর আশেপাশের অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে যারা কাজ করেন, বিশেষ করে ডিজিটাল কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং ড্রোন ভিডিওগ্রাফারদের জন্য সিংহশ্রীর এই মেলাগুলো এক চমৎকার সুযোগ। উদুই পুকুরের বিশালতা এবং মেলার রঙিন ফুটেজ ড্রোন বা উচ্চমানের ক্যামেরায় ধারণ করে এই অঞ্চলের ঐতিহ্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা সম্ভব। এটি কেবল বিনোদন নয়, বরং গাজীপুরের আঞ্চলিক ইতিহাস সংরক্ষণের একটি মাধ্যমও বটে।
গ্রামীণ মেলা কেবল কেনাকাটার জায়গা নয়, এটি মানুষের সাথে মানুষের মিলনমেলা। কাপাসিয়ার সিংহশ্রীর উদুই পুকুর পাড়ের মেলা এবং আসন্ন বৈশাখী মেলা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্য কখনো মরে যায় না যদি তা সংরক্ষণের উদ্যোগ থাকে। ১১ এপ্রিলের বৈশাখী মেলায় অংশ নিয়ে বাংলার এই অনন্য সংস্কৃতিকে উপভোগ করার আমন্ত্রণ রইল সবার প্রতি।