
মৃত্যু চিরন্তন, কিন্তু কিছু মৃত্যু পুরো একটি জনপদকে স্তব্ধ করে দেয়। আর সেই মৃত্যু যদি একই দিনে, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একটি পরিবারের দুটি প্রধান স্তম্ভকে কেড়ে নেয়, তবে তা আর কেবল সাধারণ মৃত্যু থাকে না; তা রূপ নেয় এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিতে। গত ৭ জুন ২০২৬ (রোববার) গাজীপুরের শ্রীপুরবাসী ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য, অলৌকিক অথচ নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল।
শ্রীপুর পৌরসভার ৪ বারের সফল সাবেক মেয়র, গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব মো. আনিছুর রহমান (৬৫) ঢাকার উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা তখনও বাকি ছিল। প্রিয় ছোট ভাইয়ের এই চিরবিদায়ে বুকে যে তীব্র আঘাত লেগেছিল, তা সহ্য করতে পারেননি তাঁর আপন বড় বোন রাশিদা খাতুন (৬২)। ভাইয়ের মৃত্যুর খবর পাওয়ার ঠিক পরেই তীব্র শোকে হার্ট অ্যাটাক করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনিও পাড়ি জমান পরপারে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে পিঠাপিঠি ভাই-বোনের এই মহাপ্রস্থান পুরো গাজীপুর জেলায় এক শোকের মহাপ্রলয় সৃষ্টি করেছে।
আধুনিক শ্রীপুরের রূপকার: মো. আনিছুর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান
গাজীপুরের রাজনীতিতে মো. আনিছুর রহমান একটি অতি পরিচিত এবং প্রভাবশালী নাম। শ্রীপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে এসে তিনি যেভাবে নিজেকে একজন গণমানুষের নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা সত্যি প্রশংসনীয়।
-
প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্ব: ২০০০ সালে যখন শ্রীপুর পৌরসভা গঠিত হয়, তখন এর প্রথম হাল ধরেন আনিছুর রহমান। তিনি এই পৌরসভার প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান (পরবর্তীতে মেয়র) হিসেবে দায়িত্ব নেন। একটি সদ্য গঠিত পৌরসভাকে কীভাবে একটি প্রথম শ্রেণীর (Class-A) পৌরসভায় রূপান্তর করা যায়, তার নিখুঁত রোডম্যাপ তৈরি করেছিলেন তিনি।
-
টানা চারবার বিজয়: রাজনীতিতে জোয়ার-ভাটা থাকে, কিন্তু আনিছুর রহমানের ক্ষেত্রে শ্রীপুরের সাধারণ মানুষ কখনো মুখ ফিরিয়ে নেয়নি। তিনি তাঁর সততা ও কাজের মাধ্যমে জনগণের হৃদয়ে এমন জায়গা করে নিয়েছিলেন যে, একে একে টানা চারবার তিনি শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ২০২১ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও তিনি চতুর্থবারের মতো বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে প্রমাণ করেছিলেন—শ্রীপুরের মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর সম্পর্ক কতটা গভীর।
-
দলীয় পদপ্রস্থান: স্থানীয় রাজনীতির পাশাপাশি তিনি গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘদিন সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং জেলাজুড়ে দলের ভিত শক্ত করতে রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
উন্নয়নের খতিয়ান: যাঁর হাত ধরে বদলেছিল শ্রীপুর
আজকের যে আধুনিক শ্রীপুর আমরা দেখি—চওড়া রাস্তাঘাট, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, স্ট্রিট লাইট কিংবা পরিকল্পিত নগরী—এর পেছনে সিংহভাগ অবদান সাবেক মেয়র আনিছুর রহমানের। তিনি শুধু একজন প্রশাসক ছিলেন না, ছিলেন দূরদর্শী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন মানুষ।
তাঁর চার মেয়াদের শাসনামলে শ্রীপুরের শিল্পাঞ্চলের ব্যাপক প্রসার ঘটে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শ্রীপুরে কারখানা স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করা, শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের জন্য রাস্তাঘাটের উন্নয়ন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার পেছনে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। শ্রীপুরের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সংযোগ সড়ক পাকা করা এবং গ্রামীণ অবকাঠামোকে শহরের আদলে সাজানোর কৃতিত্ব স্থানীয়রা সবসময়ই আনিছুর রহমানকেই দিয়ে থাকেন।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, মামলা এবং শেষ জীবনের একাকীত্ব
সময় সবসময় একরকম যায় না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পুরোপুরি বদলে যায়। আর এই পরিবর্তনের ঝড় এসে লাগে মেয়র আনিছুর রহমানের জীবনেও।
ক্ষমতাচ্যুতির পর তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় ও আদালতে একাধিক রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়। মামলার আইনি জটিলতা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক এবং দলের অন্যান্য নেতাকর্মীদের আত্মগোপনে চলে যাওয়ার কারণে আনিছুর রহমানও শেষ দিনগুলোতে একরকম জনসমক্ষ থেকে দূরে চলে যান। যে মানুষটি প্রতিদিন হাজারো মানুষের ভিড়ে ঘেরা থাকতেন, শেষ জীবনে তাঁকে কাটাতে হয়েছে চরম একাকীত্ব ও মানসিক চাপের মধ্যে। স্থানীয় রাজনৈতিক বোদ্ধাদের মতে, এই তীব্র মানসিক চাপ এবং রাজনৈতিক একাকীত্বই হয়তো তাঁর শারীরিক অবস্থাকে দ্রুত অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছিল।
নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস: সেই কালো রোববার
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সাবেক মেয়র আনিছুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (CKD), তীব্র হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসসহ নানা জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে তাঁকে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত ঢাকার উত্তরার একটি হাসপাতালে গিয়ে ডায়ালাইসিস করাতে হতো।
গত ৭ জুন (রোববার) দুপুরেও তিনি তাঁর ছোট ভাই মুজিবুর রহমানসহ স্বজনদের সাথে নিয়ে ঢাকা যান ডায়ালাইসিস করানোর জন্য। কিন্তু কে জানত, এটাই হবে তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা? ডায়ালাইসিস চলাকালীন হঠাৎ করেই তাঁর রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যায় এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হতে শুরু করে। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে কর্তব্যরত ডাক্তার তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ভাই-বোনের রক্তের টান: রাশিদা খাতুনের বুকফাটা বিদায়
আনিছুর রহমানের মৃত্যুর সংবাদটি যখন মোবাইল ফোনে শ্রীপুরের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন সেখানে এক কান্নার রোল পড়ে। পুরো বাড়ি মুহূর্তের মধ্যে নরকে পরিণত হয়। এই খবরটি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি তাঁর আপন বড় বোন রাশিদা খাতুন।
ছোট ভাই আনিছুর রহমানকে তিনি নিজের সন্তানের মতোই ভালোবাসতেন। ভাইয়ের এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর শোনা মাত্রই রাশিদা খাতুন চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং তীব্র বুক ব্যথায় আক্রান্ত হন। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রওনা হন। কিন্তু রক্তের টান এবং ভালোবাসার গভীরতা এতটাই তীব্র ছিল যে, ভাইয়ের মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চিকিৎসকদের মতে, এটি ছিল তীব্র মানসিক আঘাতজনিত কারণে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হার্ট অ্যাটাক।
সোশ্যাল মিডিয়ায় আবেগের জোয়ার ও সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
এই দুই ভাই-বোনের মৃত্যুর খবরটি ওইদিন রাতেই ইন্টারনেটে এবং বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে (যেমন: প্রথম আলো, ইত্তেফাক, ঢাকা ট্রিবিউন) ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রকাশিত হয়। গাজীপুর ও শ্রীপুরের ফেসবুক গ্রুপগুলো এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক অভাবনীয় আবেগের সৃষ্টি হয়।
অনেকেই লিখেছেন, “আমরা তো লাইলী-মজনু বা শিরি-ফরহাদের ভালোবাসার গল্প শুনেছি, কিন্তু ভাই-বোনের ভালোবাসার এমন জীবন্ত ও মর্মান্তিক উদাহরণ এই যুগে বিরল।” দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাও এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। রাজনীতির হিসাব-নিকাশ ভুলে সবাই এই পরিবারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
জানাজা ও শেষ বিদায়: পাশাপাশি চিরনিদ্রায়
পরদিন শ্রীপুরের স্থানীয় একটি বিশাল মাঠে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। মরহুম মেয়র আনিছুর রহমান এবং তাঁর বোন রাশিদা খাতুনের কফিন যখন পাশাপাশি রাখা হয়, তখন উপস্থিত হাজারো মানুষের চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে এই দুই ভাই-বোনের লাশ পাশাপাশি দাফন করা হয়। যে ভাই-বোন দুনিয়াতে একে অপরকে ছাড়া থাকতে পারেননি, তাঁরা কবরের অন্ধকার জগতেও পাশাপাশি ঠাঁই নিলেন।
একটি অধ্যায়ের অবসান
মো. আনিছুর রহমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শ্রীপুরের রাজনীতির একটি দীর্ঘ ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল। রাজনীতির ময়দানে তাঁর সমালোচনা বা প্রশংসা দুই-ই থাকতে পারে, কিন্তু তাঁর চলে যাওয়া এবং সাথে তাঁর বোনের এই আত্মিক বিদায় শ্রীপুরের ইতিহাসে এক কালজয়ী দুঃখগাথা হয়ে থাকবে। মৃত্যুর পর মানুষের সব ক্ষোভ-বিক্ষোভ মুছে যায়, থেকে যায় শুধু মানুষের ভালো কাজগুলো। শ্রীপুর পৌরসভা যতদিন থাকবে, এর প্রতিষ্ঠাকালীন মেয়রের নামও ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
আমরা পরম করুণাময়ের কাছে এই দুই ভাই-বোনের আত্মার মাগফিশাত কামনা করছি এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
