২০২৪ জুলাই বিপ্লব: ইন্টারনেটহীন অন্ধকারে গাজীপুর ভবানীপুরের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই, দিনটি ছিল শুক্রবার। সাধারণ ছুটির দিনের যে চিরচেনা শান্ত পরিবেশ থাকে, এই শুক্রবারটি ছিল তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগের রাত থেকেই পুরো বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছিল। বাইরের পৃথিবীর সাথে আমাদের যোগাযোগের সব পথ তখন বন্ধ। কোনো খবর পাওয়ার মাধ্যম নেই, নেই কোনো তথ্য আদান-প্রদানের উপায়।

দেশজুড়ে তখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। চারদিকে এক দমবন্ধ করা আতঙ্ক আর গভীর উৎকণ্ঠা। সাধারণ মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন—”পরের মুহূর্তে কী ঘটতে যাচ্ছে?” রাস্তাঘাট জনশূন্য, থমথমে; ঠিক যেন এক মহা প্রলয়ের পূর্বাভাস।

সেদিন ইন্টারনেট না থাকায় সংবাদের তীব্র অভাব ছিল, চারদিকে ছড়াচ্ছিল নানা গুজব। কিন্তু কোনো কিছুই মানুষকে ঘরের কোণে বন্দি করে রাখতে পারেনি। উল্টো সাধারণ মানুষের কৌতূহল এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। আমরা খবর পেয়েছিলাম, গাজীপুর চৌরাস্তায় তখন ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণপ্রতিরোধ গড়ে উঠছে।

সেই ঐতিহাসিক ও রক্তঝরা মুহূর্তগুলো ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কয়েকজন গাজীপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই—পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরতে হবে। গাড়ি নিয়ে যখন আমরা শ্রীপুর পার হচ্ছিলাম, তখনই চারপাশের পরিবেশ জানান দিচ্ছিল সামনের পরিস্থিতি কতটা থমথমে। চারদিকে সুনসান নীরবতা, আর মাঝে মাঝেই পুলিশের সাইরেনের শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠছিল।

আমরা যখন ভবানীপুর এলাকায় পৌঁছালাম, তখন দেখতে পেলাম ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। ভবানীপুর কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তার ঠিক কয়েক মিনিট আগে মহাসড়কটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একঝাঁক তপ্ত তরুণের চোখেমুখে ভয়ের কোনো লেশমাত্র ছিল না, বরং সেখানে স্পষ্ট ছিল অধিকার আদায়ের দৃঢ় সংকল্প। তারা ব্যারিকেড দিয়ে রাজপথে অবস্থান নিয়েছে এবং তাদের কণ্ঠে তখন একটাই স্লোগান—“মুক্তি চাই, অধিকার চাই”

রাস্তার এক পাশে আমরা লক্ষ্য করলাম মাত্র পাঁচজন পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে আছে। তারা মাঝে মাঝেই তেড়ে আসার ভান করছিল, যেন যেকোনো মুহূর্তে ছাত্রদের ওপর চড়াও হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস ছিল আকাশচুম্বী। ব্যানার হাতে থাকা ছাত্ররা যখন সমস্বরে আশেপাশের সাধারণ মানুষকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানালো, তখন সেখানে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো।

মুহূর্তের মধ্যে রাস্তার দুপাশের দোকানদার, পথচারী এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এসে ছাত্রদের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়ালো। ছাত্র-জনতার সেই বিশাল স্রোত দেখে ওই পাঁচজন পুলিশ সদস্য আর সামনে এগোনোর সাহস পায়নি, বরং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়।

ভবানীপুরে আন্দোলনের সেই প্রথমার্ধ ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরপুর। ছাত্ররা প্রশাসনের কোনো রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা করছিল না। পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বারবার এসে ছাত্রদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন; কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থনে ভবানীপুর তখন এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়েছে।

তবে এই শান্তি ও বীরত্বের আবহ বেশি সময় স্থায়ী হতে দেওয়া হয়নি। বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই পুরো দৃশ্যপট বদলে যায়। মাত্র পাঁচজন পুলিশের জায়গায় আচমকা বেশ কয়েক গাড়ি অতিরিক্ত পুলিশ এবং র‍্যাব সদস্য এসে উপস্থিত হয়। তারা কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই সরাসরি শান্তিপূর্ণ এই ছাত্র-জনতার সমাবেশে হামলা চালায়।

টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের তীব্র শব্দে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো ভবানীপুর এলাকা। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তবে প্রশাসনের এই বর্বরোচিত হামলায় মানুষ ভয় পেয়ে ঘরে ফিরে যায়নি; বরং প্রতিরোধের আগুন সাধারণ মানুষের মনে আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছিল।

জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন সাধারণত বড় বড় শহর কিংবা মাওনা ও গাজীপুর চৌরাস্তার বীরত্বের গল্পগুলোই বেশি সামনে আসে। কিন্তু সেই দিন নিজের চোখে যা দেখেছিলাম, তার ওপর ভিত্তি করে এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায়—ভবানীপুর কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবদান ও ত্যাগ কোনো অংশেই কম ছিল না। তারা যেভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন বা মহাসড়ক আগলে রেখে স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল, তা চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ইন্টারনেটহীন সেই অন্ধকার সময়ে ভবানীপুরের সাধারণ ছাত্র আর মেহনতি মানুষ যে প্রতিরোধের মশাল জ্বালিয়েছিল, তা-ই পরবর্তীকালে ৫ই আগস্টের মহাবিজয়ের পথকে সুগম করেছিল। এক বছর পর আজ সেই স্মৃতিগুলো যখন মনের পর্দায় ভেসে ওঠে, তখন আবারও বিশ্বাস জাগে—জনগণের একতা আর সাহসের সামনে কোনো স্বৈরাচারী শাসকই চিরকাল টিকে থাকতে পারে না।

খলিলুর কাদেরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *