
গাজীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস: ঠিকানা, আবেদন পদ্ধতি ও বিস্তারিত
প্রিয় গাজীপুরঃ গাজীপুর জেলার বাসিন্দাদের জন্য পাসপোর্ট সেবা এখন হাতের নাগালে। আপনি যদি বিদেশে কাজের জন্য, উচ্চশিক্ষা, ভ্রমণ বা চিকিৎসার জন্য যেতে চান, তবে আপনার প্রথম ধাপ হলো একটি বৈধ পাসপোর্ট তৈরি করা। গাজীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস বর্তমানে ই-পাসপোর্ট (e-Passport) প্রদানের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত স্বচ্ছ ও সহজ করেছে। আজকের এই বিস্তারিত গাইডে আমরা জানাবো অফিসের অবস্থান, যোগাযোগের নম্বর, আবেদনের নিয়ম এবং পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ যাবতীয় তথ্য।
এই আর্টিকেলে যা যা থাকছে:
- গাজীপুর পাসপোর্ট অফিসের সঠিক ঠিকানা ও ম্যাপ নির্দেশিকা
- জরুরি যোগাযোগের নম্বর ও ইমেইল
- ই-পাসপোর্ট আবেদনের সঠিক নিয়ম
- প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
- পাসপোর্ট ফি এবং ডেলিভারি সময় (২০২৬ আপডেট)
- পুলিশ ভেরিফিকেশন ও পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক
- পাসপোর্ট রিনিউ বা তথ্য পরিবর্তনের নিয়ম
- যাতায়াত ব্যবস্থা ও বিশেষ সতর্কবার্তা
১. গাজীপুর পাসপোর্ট অফিসের ঠিকানা ও অবস্থান
গাজীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসটি মহানগরীর একটি কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, যা জেলার প্রায় সকল উপজেলা থেকে সহজে পৌঁছানো যায়।
- ঠিকানা: আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, পালের মাঠ (ওয়ারলেস গেট), টিএনটি রোড, নলজানী, চান্দনা, গাজীপুর।
- নিকটবর্তী ল্যান্ডমার্ক: এটি গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (GMP) হেডকোয়ার্টার্সের অত্যন্ত কাছে এবং চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ধরে সামান্য দক্ষিণে অবস্থিত।
- ভিডিওতে আরো সহজ ভাবে দেখুনঃ ভিডিও লিংকঃ- ক্লিক
২. যোগাযোগের তথ্য
যেকোনো জিজ্ঞাসা বা অভিযোগের জন্য সরাসরি নিচের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন:
- মোবাইল নম্বর: ০১৭৩৩৩৯৩৩৩৭
- ই-মেইল: [email protected]
- অফিসিয়াল পোর্টাল: passport.gazipur.gov.bd
- হেল্পলাইন: ১৬৪৪৫ (পাসপোর্ট অধিদপ্তর)
শ্রীপুর উপজেলা থেকে:
-
বাস: শ্রীপুর বা মাওনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকা অভিমুখী যেকোনো বাসে (যেমন: প্রভাতী বনশ্রী, এনা বা অন্য লোকাল বাস) উঠুন। শ্রীপুর রেল গেট থেকে রেল গাড়ি ও সিএনজি দিয়েও খুব সহজে জয়দেবপুরে আসা যায়।
-
গন্তব্য: সরাসরি নলজানী (ওয়ারলেস গেট) বা চান্দনা চৌরাস্তা নামতে হবে।
-
টিপস: মাওনা থেকে বাসে আসতে সময় লাগবে ১ ঘণ্টা থেকে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট। নলজানী বাস স্ট্যান্ডে নামলে রাস্তা পার হয়ে ৫ মিনিট হাঁটলেই পাসপোর্ট অফিস।
কালিয়াকৈর উপজেলা থেকে:
-
বাস/লেগুনা: কালিয়াকৈর বাসস্ট্যান্ড বা চন্দ্রা মোড় থেকে গাজীপুর চৌরাস্তাগামী বাসে উঠুন।
-
গন্তব্য: চান্দনা চৌরাস্তা নামতে হবে।
-
রিকশা/অটো: চৌরাস্তা থেকে নলজানী পালের মাঠ যাওয়ার জন্য প্রচুর ইজিবাইক বা রিকশা পাওয়া যায়। ভাড়া মাত্র ১০-১৫ টাকা।
কাপাসিয়া উপজেলা থেকে:
-
বাস: কাপাসিয়া মোড় থেকে রাজেন্দ্রপুর হয়ে গাজীপুর চৌরাস্তাগামী বাসে (যেমন: রাজদূত বা সম্রাট) উঠুন।
-
গন্তব্য: চান্দনা চৌরাস্তা অথবা ভোগড়া বাইপাস মোড় নামতে হবে।
-
রিকশা/অটো: ভোগড়া বা চৌরাস্তা থেকে অটোতে করে ১০ মিনিটের মধ্যে নলজানী টিএনটি রোড বা পাসপোর্ট অফিস মোড়ে পৌঁছানো যায়।
- আবার রাজাবাড়ী থেকে সিএনজি পাওয়া যায় যা জয়দেবপুর পর্যন্ত যায়। পরে অটো দিয়ে পাসপোর্ট অফিস।
কালীগঞ্জ উপজেলা থেকে:
-
বাস/ট্রেন: কালীগঞ্জ থেকে পুবাইল হয়ে মাজুখান বা শিববাড়ীগামী বাসে আসতে পারেন। এছাড়া ট্রেনে করে জয়দেবপুর জংশনে নামতে পারেন।
-
যাতায়াত: জয়দেবপুর জংশন বা শিববাড়ী মোড় থেকে সরাসরি অটো বা লেগুনায় করে নলজানী আসা যায়।
-
সময়: শিববাড়ী থেকে পাসপোর্ট অফিসে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ১৫-২০ মিনিট।
গাজীপুর সদর উপজেলা (জয়দেবপুর শহর) থেকে:
-
রিকশা/অটো: জয়দেবপুর রাজবাড়ী মাঠ বা শিববাড়ী মোড় থেকে পাসপোর্ট অফিস বেশ কাছে। সরাসরি অটো বা রিকশায় করে টিএনটি রোড বা নলজানী পালের মাঠ আসা যায়।
-
ভাড়া: অটোতে ১০-১৫ টাকা এবং রিকশায় ৩০-৫০ টাকা ভাড়া হতে পারে।
৩. ই-পাসপোর্ট আবেদনের ধাপসমূহ
গাজীপুর অফিসে বর্তমানে শুধু ই-পাসপোর্ট সেবা দেওয়া হয়। আবেদনের ধাপগুলো হলো:
- অনলাইন রেজিস্ট্রেশন: www.epassport.gov.bd সাইটে গিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
- সঠিক তথ্য প্রদান: আপনার এনআইডি (NID) কার্ড অনুযায়ী নাম, জন্ম তারিখ এবং পিতা-মাতার নাম প্রদান করুন। সামান্য ভুল হলে পরবর্তীতে সংশোধন করা অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে।
- অফিস নির্বাচন: আপনার স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানা যদি গাজীপুর জেলার আওতায় হয়, তবে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘Regional Passport Office, Gazipur’ নির্বাচন করবে।
- অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লিপ: ফরম পূরণ শেষে ছবি ও আঙুলের ছাপ দেওয়ার জন্য একটি তারিখ (Slot) বুক করুন।
- আবেদনে ডট: যাদের এনআইডিতে ডট থাকে তারা অবশ্যই ডট ছাড়া আবেদন করবেন। ডট দিয়ে আবেদন করলে আবেদন বাতিল হয়ে যাবে। সঠিক নিয়মে পাসপোর্টের আবেদন কিভাবে করতে হয় এ সম্পর্কে ভিডিও দেখুন। ভিডিও- ক্লিক
৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা
বায়োমেট্রিক প্রদানের দিন আপনাকে নিচের কাগজগুলো সাথে নিয়ে যেতে হবে:
- অনলাইন আবেদনের প্রিন্ট কপি (Application Summary)।
- ৩ পাতার আবেদন কপি।
- পেমেন্ট স্লিপ (ব্যংক এ-চালান বা অনলাইন পেমেন্ট কপি)।
- মূল এনআইডি (NID) কার্ড এবং এর ১ কপি ফটোকপি।
- ১৮ বছরের কম হলে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন (BRC) সনদ।
- পেশার প্রমাণপত্র (Student ID কার্ড বা চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে NOC/GO)।
- স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ (বিদ্যুৎ বিল বা নাগরিকত্ব সনদ)।
- পুরাতন পাসপোর্ট থাকলে মূল কপি এবং ডাটা পেজের ফটোকপি।
- পিতা-মাতার আইডি কার্ড। (৩০ বছরের কম হলে)।
- বিবাহিত হলে ম্যারেজ সার্টিফিকেট।
৫. পাসপোর্ট ফি ও ডেলিভারি সময়
গাজীপুর পাসপোর্ট অফিসে আবেদনের ধরন অনুযায়ী ফি এবং সময় ভিন্ন হতে পারে:
| ডেলিভারি ধরন | সময়সীমা | ফি (৫ বছর মেয়াদ) |
|---|---|---|
| রেগুলার (Regular) | ১৫ – ২১ কর্মদিবস | ৪,০২৫ টাকা |
| এক্সপ্রেস (Express) | ৭ – ১০ কর্মদিবস | ৬,৩২৫ টাকা |
| সুপার এক্সপ্রেস | ২ কর্মদিবস | ৮,৬২৫ টাকা |
১০ বছর মেয়াদী ই-পাসপোর্ট ফি তালিকা
২০২৬ সালের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্টের ফি পাসের পৃষ্ঠা এবং ডেলিভারির গতির ওপর নির্ভর করে। নিচে বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:
৪৮ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট (১০ বছর মেয়াদ)
| ডেলিভারির ধরন | সময়সীমা | ফি (ভ্যাটসহ) |
|---|---|---|
| রেগুলার (Regular) | ১৫ – ২১ কর্মদিবস | ৫,৭৫০ টাকা |
| এক্সপ্রেস (Express) | ৭ – ১০ কর্মদিবস | ৮,০৫০ টাকা |
| সুপার এক্সপ্রেস | ২ কর্মদিবস | ১০,৩৫০ টাকা |
৬৪ পৃষ্ঠার পাসপোর্ট (১০ বছর মেয়াদ)
| ডেলিভারির ধরন | সময়সীমা | ফি (ভ্যাটসহ) |
|---|---|---|
| রেগুলার (Regular) | ১৫ – ২১ কর্মদিবস | ৮,০৫০ টাকা |
| এক্সপ্রেস (Express) | ৭ – ১০ কর্মদিবস | ১০,৩৫০ টাকা |
| সুপার এক্সপ্রেস | ২ কর্মদিবস | ১২,০৭৫ টাকা |
*উল্লেখ্য: ১০ বছর মেয়াদী পাসপোর্ট শুধুমাত্র ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য প্রযোজ্য।
৬. পুলিশ ভেরিফিকেশন ও পাসপোর্ট চেক
নতুন পাসপোর্টের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক। আবেদনের কয়েকদিনের মধ্যে আপনার ঠিকানায় স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB) থেকে পুলিশ সদস্য যোগাযোগ করবেন। ভেরিফিকেশন শেষ হলে আপনি মোবাইলে SMS পাবেন। আপনার পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থা জানতে Application ID লিখে ১৬৪৪৫ নম্বরে মেসেজ পাঠাতে পারেন অথবা অনলাইন পোর্টালে চেক করতে পারেন। (তবে ২০২৫ সাল হতে এটি স্থগিত করা আছে)
৭. পাসপোর্ট রিনিউ বা তথ্য সংশোধন
আপনার যদি আগে এমআরপি (MRP) বা ই-পাসপোর্ট থাকে এবং সেটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, তবে একই পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে। শুধু আবেদনের সময় ‘Renewal’ অপশন সিলেক্ট করতে হবে এবং পুরাতন পাসপোর্টটি অফিসে জমা দিতে হবে। তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রমাণপত্র (যেমন- শিক্ষাগত সনদ বা এনআইডি সংশোধনের কপি) যুক্ত করা আবশ্যক।
৮. যাতায়াত ও সময় বাঁচানোর টিপস
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর, কাপাসিয়া বা কালিয়াকৈর থেকে যারা আসবেন, তারা চান্দনা চৌরাস্তায় এসে অটো বা রিকশা নিয়ে ‘নলজানী পালের মাঠ’ এলাকায় পৌঁছাতে পারবেন।
পরামর্শ: ভিড় এড়াতে সকাল ৮:৩০ মিনিটের মধ্যে লাইনে দাঁড়ানো ভালো। এছাড়া দালালের খপ্পরে পড়বেন না; কোনো তথ্যের জন্য সরাসরি অফিসের হেল্প ডেস্কে কথা বলুন।
গাজীপুর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এখন অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। সঠিক নথিপত্র এবং অনলাইন আবেদন সম্পন্ন করে গেলে আপনি কোনো ভোগান্তি ছাড়াই আপনার কাঙ্ক্ষিত পাসপোর্ট হাতে পেতে পারেন। এই আর্টিকেলটি উপকারী মনে হলে গাজীপুরের অন্যান্য বাসিন্দাদের সাথে শেয়ার করুন।
বি:দ্র: সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফি বা নিয়মের পরিবর্তন হতে পারে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফলো করুন।
