
প্রিয় গাজীপুর গাজীপুর জেলাজুড়ে এখন একটিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—কাপাসিয়ার দিগাবো (দীঘাবর) গ্রামের এক অলৌকিক আনন্দের গল্প। চারপাশের সব জল্পনা-কল্পনা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের যাবতীয় ঝুঁকিকে জয় করে কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়নের এক গৃহবধূ একসঙ্গে ৫টি সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। এই বিরল ও আনন্দের সংবাদটি শুধু কাপাসিয়াতেই নয়, বরং পুরো গাজীপুর জেলা এবং দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। ৫ নবজাতকের সুস্থভাবে পৃথিবীতে আগমন এবং সফল চিকিৎসা শেষে তাদের মায়ের কোলে চড়ে বাড়ি ফেরার প্রতিটি মুহূর্ত যেন কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়।
ঘটনার পটভূমি: কাজল-মাসুমা দম্পতির ঘরে আনন্দের জোয়ার
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার টোক ইউনিয়নের দিগাবো গ্রামের বাসিন্দা কাজল মিয়া এবং তাঁর স্ত্রী মাসুমা আক্তার (৩০)। এই দম্পতির ঘরে আগে থেকেই ৯ বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। কাজল মিয়া পেশায় মূলত একজন প্রবাসী (বর্তমানে স্থানীয়ভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল)। মধ্যবিত্ত বা স্বল্প আয়ের এই পরিবারে হঠাৎ করেই এক অভাবনীয় আনন্দের বার্তা আসে।
গত ৫ এপ্রিল প্রসব বেদনা নিয়ে মাসুমা আক্তারকে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (পিজি হাসপাতাল) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের পর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল এক সিজারিয়ান (সি-সেকশন) অপারেশনের মাধ্যমে মাসুমার কোলজুড়ে আসে ৫টি সন্তান। নবজাতকদের মধ্যে ৩টি ছেলে এবং ২টি মেয়ে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনন্য এক সাফল্য ও শিশুদের শারীরিক অবস্থা
একসঙ্গে ৫টি শিশুর জন্ম হওয়া চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা। সাধারণত এমন ক্ষেত্রে গর্ভধারণের সময়কাল পূর্ণ হয় না এবং নবজাতকদের ওজন অত্যন্ত কম থাকে, যার ফলে তাদের বেঁচে থাকার হার এবং নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। কিন্তু কাপাসিয়ার মাসুমা বেগমের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা এক অভূতপূর্ব ও আশাব্যঞ্জক চিত্র দেখতে পান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জন্ম নেওয়া ৫টি শিশুর সম্মিলিত ওজন ছিল প্রায় ৮ কেজি! চিকিৎসকদের মতে, প্রতিটি শিশুর ওজন গড়ে ১ কেজি ৪০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি ৫০০ গ্রামের মধ্যে ছিল, যা এই ধরনের বহু-গর্ভধারণ (Multiple Pregnancy) পরিস্থিতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাপ্রদ লক্ষণ।
অপারেশনটি সফলভাবে সম্পন্ন করার পেছনে ছিলেন দেশের প্রখ্যাত এবং দেশবরেণ্য চিকিৎসক, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. রুহুল আমিন। তাঁর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক দলের নিপুণ দক্ষতায় কোনো বড় ধরনের জটিলতা ছাড়াই অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়। তবে জন্মের পরপরই নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা ও সুস্থতা নিশ্চিত করতে কিছুদিন হাসপাতালের এনআইসিইউ (NICU) এবং পরবর্তীতে বিশেষ আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল।
রাজধানী থেকে কাপাসিয়ায় ফেরা: এলাকায় উৎসবের আমেজ
হাসপাতালে টানা ৫ দিন নিবিড় চিকিৎসাসেবা এবং পর্যবেক্ষণ শেষে গত ১০ এপ্রিল বিকেলে মা ও ৫ নবজাতককে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় তাদের কাপাসিয়ার নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। বাড়ি ফেরার আগে ডা. রুহুল আমিনের প্রতিষ্ঠিত কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদ মগারটেক এলাকার মডিউল কমিউনিটি হাসপাতালেও শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়।
৫ সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় নিয়ে যখন মা মাসুমা আক্তার দিগাবো গ্রামে পা রাখেন, তখন পুরো এলাকাবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। এলাকায় এই বিরল খবর ছড়িয়ে পড়লে কাজল মিয়ার বাড়িতে উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ একনজর এই অলৌকিক শিশুদের দেখার জন্য ছুটে আসছেন। মিষ্টি বিতরণ ও আনন্দের হাসিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে পুরো দিগাবো গ্রাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গাজীপুরের এই ঘটনা নিয়ে বইছে ইতিবাচক প্রশংসার ঝড়।
পিতা-মাতার অনুভূতি এবং আগামী দিনের স্বপ্ন
একসঙ্গে ৫টি সন্তানকে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা বাবা কাজল মিয়া। তিনি তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, “আমি কখনো ভাবিনি যে আমার স্ত্রী ও সন্তানদের এভাবে সুস্থভাবে হাসিমুখে এক সাথে বাড়ি ফিরে পাব। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন। মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া।” তবে আনন্দের পাশাপাশি এক বিশাল দায়িত্ব ও চিন্তার রেখাও দেখা দিয়েছে এই কৃষক বাবার কপালে। কাজল মিয়া বর্তমানে সৌদি আরব প্রবাসী হলেও তাঁর আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বর্তমানে তিনি স্থানীয়ভাবে কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। স্বল্প আয়ে আগের এক সন্তানসহ এখন মোট ছয় সন্তানকে লালনপালন করে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা তাঁর জন্য বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
মা মাসুমা আক্তারও তাঁর সন্তানদের সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। তিনি জানান, কষ্ট হলেও তিনি তাঁর সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বক্তব্য ও পরম পরামর্শ
পল্লী মডিউল হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. কামরুজ্জামান সেলিম এবং হাসপাতালের পরিচালক আশরাফুল আলম সোহেল এই ঘটনা সম্পর্কে জানান, বাংলাদেশে একসঙ্গে ৫টি সুস্থ শিশু জন্মানোর এবং পরবর্তীতে মা ও সব শিশুর পুরোপুরি সুস্থ থাকার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। তারা জানান, ৫ নবজাতকের মধ্যে একজনের শারীরিক অবস্থা প্রথম দিকে কিছুটা জটিল মনে হলেও বিশেষ আইসোলেশন ও পর্যবেক্ষণের পর এখন সবাই আশঙ্কামুক্ত। তবে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যেহেতু সাধারণ শিশুদের চেয়ে কিছুটা কম হতে পারে, তাই পরিবারকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে যেন দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করা হয়, সেই চিকিৎসাগত ব্যবস্থাও তৈরি রাখা হয়েছে।
‘প্রিয় গাজীপুর’-এর আহ্বান: এই আনন্দ হোক সবার
গাজীপুরের কাপাসিয়ার এই কাজল-মাসুমা দম্পতি আজ শুধু একটি পরিবারের পিতা-মাতা নন, তারা আমাদের পুরো গাজীপুর জেলার গর্বের এক প্রতীক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অভাবনীয় সাফল্যের মধ্য দিয়ে যে ৫টি প্রাণ পৃথিবীতে এসেছে, তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্বের অংশ হতে পারে। স্বল্প আয়ের এই কৃষক পিতার পক্ষে একসাথে ৫টি শিশুর দুধ, পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা ও ভবিষ্যতের পড়াশোনার খরচ চালানো বেশ কষ্টসাধ্য। তাই স্থানীয় প্রশাসন, বিত্তবান সমাজ এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি ‘প্রিয় গাজীপুর’ পরিবারের আহ্বান—আসুন, আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে এই সুন্দর পরিবারটির পাশে দাঁড়াই এবং এই ৫টি ফুটফুটে শিশুর ভবিষ্যৎ সুন্দর ও নিরাপদ করতে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিই।
৫টি নবজাতক—৩টি ছেলে ও ২’টি মেয়ের সুস্থ, দীর্ঘ ও সুন্দর জীবনের জন্য ‘প্রিয় গাজীপুর’-এর পক্ষ থেকে রইল অফুরন্ত শুভকামনা ও ভালোবাসা!
