গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের (গাসিক) আওতাভুক্ত হাট-বাজার, গণশৌচাগার ও খেয়াঘাট ইজারা প্রক্রিয়া মূলত একটি বার্ষিক প্রশাসনিক কার্যক্রম। ২০২৬ সাল তথা বাংলা ১৪৩৩ সনের ইজারা কার্যক্রমকে সামনে রেখে একজন সম্ভাব্য ইজারাদার বা সচেতন নাগরিক হিসেবে আপনার যা জানা প্রয়োজন, তা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (গাসিক) ইজারা নির্দেশিকা ২০২৬
গাজীপুর দেশের অন্যতম বৃহত্তম এবং শিল্পসমৃদ্ধ সিটি কর্পোরেশন। এখানে বিপুল সংখ্যক কর্মজীবী মানুষের বসবাস এবং অসংখ্য হাট-বাজার বিদ্যমান। সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ আসে এই ইজারা খাত থেকে।
১. ইজারার প্রধান ক্ষেত্রসমূহ
গাসিক সাধারণত তিনটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ইজারা প্রদান করে:
-
হাট-বাজার: গাজীপুরের গুরুত্বপূর্ণ বাজার যেমন—জয়দেবপুর বাজার, টঙ্গী বাজার, বোর্ড বাজার, কোনাবাড়ী বাজার এবং মিরের বাজারসহ বিভিন্ন অস্থায়ী পশুর হাট (বিশেষ করে কোরবানির ঈদের সময়)।
-
গণশৌচাগার: বিশেষ করে টঙ্গী ও জয়দেবপুর বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা এবং ব্যস্ততম মোড়গুলোতে অবস্থিত শৌচাগারসমূহ।
-
খেয়াঘাট: তুরাগ নদী ও অন্যান্য শাখা নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ খেয়াঘাটসমূহ।
২. ইজারা বিজ্ঞপ্তি ও সিডিউল সংগ্রহ
১৪৩৩ বঙ্গাব্দের (২০২৬) ইজারা কার্যক্রম সাধারণত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে শুরু হবে।
-
বিজ্ঞপ্তি প্রচার: গাসিক তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে (gazipurcity.gov.bd) এবং অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক (একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি) পত্রিকায় দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।
-
সিডিউল বিক্রয়: বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত নির্ধারিত ব্যাংক (সাধারণত সোনালী ব্যাংক বা অগ্রণী ব্যাংকের নির্দিষ্ট শাখা) অথবা নগর ভবনের সম্পত্তি বিভাগ থেকে অফেরতযোগ্য মূল্যে দরপত্র বা সিডিউল কেনা যায়। সিডিউলের দাম ইজারার সরকারি মূল্যের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
৩. অংশগ্রহণের যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র
ইজারা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সিটি কর্পোরেশন নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করে থাকে। আবেদনকারীকে অবশ্যই নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে:
-
হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স: আবেদনকারী বা প্রতিষ্ঠানের নামে বৈধ ট্রেড লাইসেন্স।
-
টিন (TIN) সার্টিফিকেট: আয়কর প্রদানের প্রমাণপত্র এবং হালনাগাদ রিটার্ন দাখিলের কপি।
-
ভ্যাট (VAT) রেজিস্ট্রেশন: ইজারা মূল্যের ওপর ভ্যাট প্রদানের জন্য বিন (BIN) নম্বর প্রয়োজন।
-
আর্থিক সচ্ছলতার সনদ: ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত সচ্ছলতা সার্টিফিকেট (Bank Solvency Certificate)।
-
জাতীয় পরিচয়পত্র: আবেদনকারীর এনআইডি (NID) কার্ডের সত্যায়িত ফটোকপি।
-
অভিজ্ঞতা সনদ (যদি থাকে): পূর্বে কোনো হাট বা ঘাট ইজারা নেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলে সেটি বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
৪. দরপত্র জমা ও জামানত প্রক্রিয়া
দরপত্র জমা দেওয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমানত (Earnest Money)।
-
পে-অর্ডার: মোট উদ্ধৃত দরের (Quoted Price) একটি নির্দিষ্ট অংশ (সাধারণত ৫% থেকে ১০%) ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমা দিতে হয়। দরদাতা যদি কাজ না পান, তবে এই টাকা তাকে ফেরত দেওয়া হয়।
-
বক্স ওপেনিং: সাধারণত মেয়র বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার উপস্থিতিতে একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দরপত্র বাক্স খোলা হয়। সর্বোচ্চ দরদাতাকে (যদি তা সরকারি দরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়) প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়।
৫. ইজারার শর্তাবলী ও আচরণবিধি
ইজারা পাওয়ার পর ইজারাদারকে বেশ কিছু কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়:
-
টোল চার্ট প্রদর্শন: প্রতিটি হাট, বাজার বা ঘাটে সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক অনুমোদিত ‘টোল চার্ট’ বা ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখতে হবে। অতিরিক্ত টোল আদায় করা দণ্ডনীয় অপরাধ।
-
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা: বিশেষ করে গণশৌচাগার ও বাজারের ক্ষেত্রে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইজারাদারের দায়িত্ব। নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়।
-
শৃঙ্খলা রক্ষা: কোনো ইজারাদার যদি জনজীবনে বিঘ্ন ঘটান বা অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন, তবে তার ইজারা বাতিলসহ কালো তালিকাভুক্ত করা হতে পারে।
৬. ২০২৬ (১৪৩৩ সন) এর জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও পরামর্শ
গাজীপুরের নগরায়ন দ্রুত বাড়ছে, তাই ইজারা মূল্যে এবার কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আপনাকে কিছু কৌশল অবলম্বন করতে হবে:
-
সরেজমিনে পরিদর্শন: দরপত্র জমার আগে সংশ্লিষ্ট হাট বা ঘাটটি নিজে পরিদর্শন করুন। সেখানে দৈনিক মানুষের যাতায়াত এবং বর্তমান আয়ের উৎস যাচাই করুন।
-
যৌক্তিক দর নির্ধারণ: অনেক সময় আবেগপ্রবণ হয়ে অতিরিক্ত দর দিলে পরবর্তীতে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি ‘বেজ প্রাইস’ (Base Price) খেয়াল রেখে দর প্রস্তাব করুন।
-
আইনি সহায়তা: চুক্তিনামার প্রতিটি ধারা মন দিয়ে পড়ুন। বিশেষ করে রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও সরকারি ট্যাক্স সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নিন।
৭. গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ
ইজারা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য আপনি সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন:
-
প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন।
-
আঞ্চলিক কার্যালয়: আপনার এলাকা যে জোনের (টঙ্গী, কোনাবাড়ী, গাছা ইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত, সেই আঞ্চলিক অফিস থেকেও তথ্য পেতে পারেন।
গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের ১৪৩৩ সনের ইজারা কার্যক্রম একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এতে সঠিক নিয়ম মেনে অংশগ্রহণ করলে যেমন ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়া সম্ভব, তেমনি সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখা যায়। সব সময় সরকারি ওয়েবসাইটের নোটিশ বোর্ডের দিকে লক্ষ্য রাখুন যাতে সঠিক সময়ে নির্ভুল আবেদন করতে পারেন।
ইজারার মূল লিংক এ গিয়ে আরো বিস্তারির দেখে নিন- http://gcc.portal.gov.bd/pages/notification-circulars
