শত বছরের লোকজ ঐতিহ্য: কাপাসিয়ার বরিবাড়িতে জমজমাট ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতা ২০২৬, মাতল হাজারো দর্শক!

ডিজিটাল যুগে এসে আমরা যখন বিনোদনের জন্য ফেসবুকের রিলস কিংবা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকি, ঠিক তখনই আমাদের গ্রামবাংলা মনে করিয়ে দেয়—আসল আনন্দ লুকিয়ে আছে মাটির গন্ধে আর লোকজ ঐতিহ্যে। গত ২৯ মে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার বরিবাড়ি গ্রামে এমনই এক চোখধাঁধানো এবং রোমাঞ্চকর উৎসবের সাক্ষী হলো হাজার হাজার মানুষ। উপলক্ষ ছিল—ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতা ২০২৬।

সামনাসামনি না দেখলে আসলে কোনোভাবেই অনুধাবন করা সম্ভব নয় যে, একটা অবুঝ প্রাণী মানুষের বিনোদনের জন্য কতটা বুক ফেটে পরিশ্রম করে! বাতাসের গতিতে ধুলো উড়িয়ে যখন ঘোড়াগুলো মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছিল, তখন গায়ের পশম খাড়া হয়ে যাওয়ার মতো এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। আজকের এই বিস্তারিত ব্লগে আপনাদের নিয়ে যাব বরিবাড়ির সেই উৎসবের মাঠে, জানাব এই মেলার ইতিহাস, প্রতিযোগিতার খুঁটিনাটি এবং পুরস্কারের আদ্যোপান্ত।

শত বছরের ইতিহাস: বৈশাখী মেলা থেকে ঈদের আনন্দ

কাপাসিয়ার এই ঘোড়াদৌড় কিন্তু দু-এক দিনের কোনো নতুন আয়োজন নয়। স্থানীয় প্রবীণ এবং মুরুব্বিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই প্রতিযোগিতার বয়স প্রায় ১০০ বছরেরও বেশি। অর্থাৎ, ব্রিটিশ আমল বা তারও আগে থেকে এই অঞ্চলে ঘোড়াদৌড়ের প্রচলন ছিল। গাজীপুরের ভাওয়াল পরগনা ও তার আশেপাশের অঞ্চলের গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ এই খেলা।

একটা সময় ছিল যখন বাংলা নববর্ষ অর্থাৎ বৈশাখ মাস উপলক্ষে এই প্রতিযোগিতার ডাক দেওয়া হতো। চৈত্র সংক্রান্তি ও বৈশাখী মেলার অংশ হিসেবে দূর-দূরান্ত থেকে সওয়ারিরা আসতেন। তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের কর্মব্যস্ততা বেড়েছে। তাই সবার ছুটির দিন এবং উৎসবের আমেজকে একসঙ্গে মিলিয়ে নিতে এখন এই আয়োজনটি প্রতি বছর ঈদুল আজহার (কোরবানির ঈদ) ঠিক পরের দিন অনুষ্ঠিত হয়।

এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ঈদের পরদিনই কাপাসিয়ার বরিবাড়ি গ্রাম এবং এর পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলো যেন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। ঈদ উপলক্ষে বাড়ি আসা মানুষগুলোর আনন্দের মাত্রা এই খেলা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মাঠের ভেতরের চিত্র: ২০২৬ সালের জমজমাট আসর

দুপুর গড়াতেই বরিবাড়ি মাঠের চারপাশ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কাপাসিয়া তো বটেই, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো থেকেও হাজার হাজার দর্শক দুপুরের কড়া রোদ উপেক্ষা করে মাঠে এসে হাজির হন। গ্রামীণ নারীরা বাড়ির ছাদ কিংবা গাছের ডালে উঠেও এই খেলা উপভোগ করার জন্য জায়গা করে নেন।

আয়োজক কমিটির তথ্যমতে, এবারের ২০২৬ সালের আসরে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রায় ৫০ থেকে ৫২টি রেসের ঘোড়া অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে চূড়ান্ত বাছাই পর্ব শেষে প্রায় ৪০টি ঘোড়া নিয়ে মূল মাঠের লড়াই শুরু হয়।

“ঘোড়া তো পরিশ্রম করে মানুষকে বিনোদন দেয়, আজ সামনাসামনি নিজের চোখে না দেখলে এই কষ্ট আর আনন্দের সমীকরণটা কোনোদিন বুঝতামই না।” — মাঠে উপস্থিত এক আবেগাপ্লুত দর্শকের এই কথাটিই যেন পুরো উৎসবের মূল সুর। সওয়ারির চাবুকের ঘা আর ঘোড়ার খুরের আওয়াজে পুরো মাঠ তখন থরথর করে কাঁপছিল।

৬ রাউন্ডের শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই ও চূড়ান্ত ফলাফল

এবারের প্রতিযোগিতাটি সাধারণ কোনো দৌড় ছিল না। টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে টানা ৬ রাউন্ড খেলা অনুষ্ঠিত হয়। একেকটি রাউন্ড শেষ হচ্ছিল আর দর্শকদের করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠছিল পুরো বরিবাড়ি। ঘোড়াগুলোর ক্ষিপ্রতা আর সওয়ারিদের নিয়ন্ত্রণ দক্ষতা ছিল দেখার মতো।

প্রতিযোগিতাটিকে মূলত দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছিল: বড় দল এবং ছোট দল। এবারের আসরে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে বড় দলের চূড়ান্ত লড়াইয়ে প্রথম স্থান ছিনিয়ে নেয় কিশোরগঞ্জ থেকে আসা একটি দুর্দান্ত ঘোড়া। কিশোরগঞ্জের ঘোড়ার সেই রাজকীয় দৌড় মাঠের সবাইকে মুগ্ধ করেছে।

বিজয়ীদের উৎসাহিত করতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আকর্ষণীয় নগদ অর্থ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়। নিচে পুরস্কারের বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:

প্রতিযোগিতার পুরস্কার ও ফলাফল টেবিল:

ক্যাটাগরি / দল অর্জিত স্থান পুরস্কারের পরিমাণ (নগদ টাকা) বিজয়ী ঘোড়ার অঞ্চল
বড় দল (Senior Group) ১ম স্থান ১০,০০০/- টাকা কিশোরগঞ্জ
২য় স্থান ৭,০০০/- টাকা স্থানীয়/অন্যান্য
৩য় স্থান ৫,০০০/- টাকা স্থানীয়/অন্যান্য
ছোট দল (Junior Group) ১ম স্থান ৮,০০০/- টাকা স্থানীয়/অন্যান্য
২য় স্থান ৫,০০০/- টাকা স্থানীয়/অন্যান্য
৩য় স্থান ৩,০০০/- টাকা স্থানীয়/অন্যান্য

রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি

এই ধরণের বড় আয়োজন সফল করতে স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি। বরিবাড়ির এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রতি বছরের মতো এবারও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মাঠে উপস্থিত থেকে উৎসবের আমেজ বাড়িয়ে দেন।

এবারের ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি রিয়াজুল হান্নান। এছাড়াও এলাকার সমাজসেবক, স্থানীয় ইউপি সদস্য এবং সুশীল সমাজের বহু প্রতিনিধি এই খেলায় অতিথি হিসেবে আসন অলঙ্কৃত করেন।

অতিথিরা তাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “আজকের তরুণ সমাজ যখন মোবাইল গেম আর মাদকের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ধরণের শত বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্যই পারে তাদের সুস্থ বিনোদন দিতে। কাপাসিয়ার এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে আমরা সবসময় জনগণের পাশে আছি।” খেলা শেষে অতিথিরা অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেন।

কাপাসিয়ার গ্রামীণ সংস্কৃতির দর্পণ

গাজীপুরের কাপাসিয়া অঞ্চলটি বরাবরই তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। বরিবাড়ি গ্রামের পাশাপাশি এর আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রামেও বছরের বিভিন্ন সময়ে এই ধরণের ঐতিহ্যবাহী মেলার আয়োজন করা হয়। তবে বরিবাড়ির ঈদের পরের দিনের এই ঘোড়াদৌড় এখন এই অঞ্চলের একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এটি শুধু একটি খেলা নয়, এটি আশেপাশের ১০টি গ্রামের মানুষের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির প্রতীক।

ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই

দিনশেষে যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ছিল, মেলা ভাঙার বাঁশি বাজছিল, তখনো দর্শকদের চোখে-মুখে ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তির ছোঁয়া। কাপাসিয়ার বরিবাড়ির এই সফল আয়োজন প্রমাণ করে যে, বাঙালি তার শিকড়কে কখনো ভুলে যায় না। সুযোগ পেলে হাজার হাজার মানুষ এখনো মাঠের দিকে ছুটে আসে গ্রামীণ সংস্কৃতির টানে।

আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, শত বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতা আগামী বছরগুলোতেও নিয়মিতভাবে চালু থাকবে এবং আরও বড় পরিসরে আয়োজন করা হবে।

আপনার মতামত জানান: আপনি কি এবারের কাপাসিয়ার ঘোড়াদৌড় প্রতিযোগিতায় উপস্থিত ছিলেন? কিশোরগঞ্জের বিজয়ী ঘোড়াটির দৌড় আপনার কেমন লেগেছে? অথবা আপনার এলাকায় এমন কোনো ঐতিহ্যবাহী খেলা হয় কি না—তা নিচে কমেন্ট করে আমাদের সাথে শেয়ার করুন! এই ব্লগটি ভালো লাগলে ফেসবুক ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যকে সবার সামনে তুলে ধরুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *