রহস্যঘেরা ‘ধাঁধার চর’: ইতিহাস, একডালা দুর্গ এবং বর্তমান অস্তিত্বের সংকট

গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার এক অনন্য প্রাকৃতিক নিদর্শনের নাম ‘ধাঁধার চর’। শীতলক্ষ্যা নদীর বুক চিরে জেগে ওঠা প্রায় ২ কিলোমিটার লম্বা এই দ্বীপ সদৃশ ভূখণ্ডটি এক সময় পর্যটকদের কাছে ‘মিনি মালদ্বীপ’ নামে পরিচিত ছিল স্থানীয়ভাবে “সেন্টমার্টিন দ্বীপ” নামেও পরিচিত। রানীগঞ্জ থেকে তারাগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত এই চরটি কেবল একটি বালুচর নয়, বরং এটি গাজীপুরের ইতিহাস, ভূ-রাজনীতি এবং বিবাদের এক জীবন্ত সাক্ষী।

লেখক ও গবেষক নাজিব মাহফুজ খান এর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ ও প্রিয় গাজীপুর ডট কম এর সংগ্রহ করা বর্তমান পরিস্থিতির তথ্যগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে ‘ধাঁধার চর’ নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত আর্টিকেল নিচে দেওয়া হলো। এটি অনেকের জন্য হয়তো একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করবে।

ভৌগোলিক অবস্থান ও সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য

ধাঁধার চরের অবস্থানটি অত্যন্ত কৌশলগত। এটি ঠিক সেই জায়গায় অবস্থিত যেখানে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র এবং বানার নদ মিলিত হয়ে শীতলক্ষ্যা নাম ধারণ করেছে।

  • সৃষ্টির সময়কাল: জনশ্রুতি অনুযায়ী এই চরটি ২০০ বছরেরও বেশি প্রাচীন। তবে ১৯১৪ সালে ঘোড়াশাল রেলসেতু নির্মাণের পর নদীর পলি জমরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, ফলে চরটি আরও স্থিতিশীল এবং দীর্ঘায়িত হয়।

  • সিএস (CS) রেকর্ড: ১৯১৫ সালের সিএস জরিপে এই অঞ্চলের নকশায় চরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ব্রিটিশ আমল থেকেই এটি একটি স্থায়ী ভূখণ্ড হিসেবে দালিলিক স্বীকৃতি পেয়েছে।

  • নামকরণের কারণ: চরের চারপাশ নদীবেষ্টিত এবং এর ভেতরের ঝোপঝাড় ও আঁকাবাঁকা আলপথগুলো এতটাই গোলমেলে ছিল যে, আগন্তুকরা ভেতরে ঢুকে পথ হারিয়ে ফেলতেন। এই ‘ধাঁধায়’ ফেলে দেওয়ার গুণের কারণেই এর নাম হয়েছে ‘ধাঁধার চর’। স্থানীয়রা একে ‘মাঝের চর’ বলেও ডাকেন।

একডালা দুর্গ ও ঐতিহাসিক ভ্রান্তি

চরের ঠিক দক্ষিণেই ঐতিহাসিক একডালা গ্রাম। অনেক লেখক ও গবেষক (যেমন জেমস টেলর) কাপাসিয়ার এই একডালাকে সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সেই বিখ্যাত ‘একডালা দুর্গ’ বলে দাবি করেছেন।

  • আসল তথ্য: আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, সুলতানী আমলের একডালা দুর্গ ছিল পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এলাকায়। তবে কাপাসিয়ার এই একডালাতেও একটি শক্তিশালী দুর্গ ছিল, যা সম্ভবত বারো ভূঁইয়া প্রধান ঈশা খাঁর প্রতিরক্ষা দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

  • বর্তমান অবস্থা: নদী ভাঙনের ফলে এই প্রাচীন দুর্গের সিংহভাগ এখন শীতলক্ষ্যার গর্ভে। গুগলে এই দুর্গের নামে যে সব ছবি দেখা যায়, তার বেশিরভাগই বিভ্রান্তিকর বা অন্য কোনো স্থানের ছবি।

ধাঁধার চর এর বর্তমান পরিস্থিতি: পর্যটন বনাম কৃষি ও দখল

এক সময় এই চরে নৌকা ভ্রমণের ধুম থাকলেও বর্তমানে এর পরিস্থিতি বেশ নাজুক। অনলাইন এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বর্তমান অবস্থা নিম্নরূপ:

  • ফসলের খনি: চরটি বর্তমানে অত্যন্ত উর্বর। এখানে এখন আর কাশবন নেই, বরং পুরোটা জুড়ে রয়েছে পেয়ারা বাগান, লেবু বাগান এবং শীতকালীন সবজির ক্ষেত। স্থানীয় কৃষকরা একে জীবিকার প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করছেন।

  • নিরাপত্তাহীনতা ও অপরাধ: পর্যটক কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো নিরাপত্তা। নির্জন হওয়ার সুযোগে এখানে মাদক সেবন এবং অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অতীতে এখানে হত্যাকাণ্ড ও ছিনতাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে।

  • যোগাযোগের সংকট: রানীগঞ্জ বা তারাগঞ্জ থেকে চরে যাওয়ার জন্য উন্নত কোনো ট্রলার বা নৌ-সার্ভিস নেই। বর্ষায় পানি বাড়লে নৌকা ছাড়া চলাফেরা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

  • দখলদারিত্ব: সরকারিভাবে এটি ‘দর্শনীয় স্থান’ হিসেবে স্বীকৃত হলেও স্থানীয়দের মধ্যে জমি নিয়ে বিবাদ এবং দখলদারিত্বের কারণে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশাধিকার অনেকটা সীমিত হয়ে পড়েছে।

কেন কেউ এখন আর ঘুরতে যায় না?

ফেসবুক এবং বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে স্থানীয়দের মন্তব্যে উঠে এসেছে যে: ১. নিরাপত্তার অভাব: পর্যটকদের জন্য কোনো পুলিশি টহল বা গার্ড নেই। ২. সুযোগ-সুবিধার অভাব: বসার জায়গা, টয়লেট বা খাওয়ার মতো কোনো নূন্যতম পরিকাঠামো এখানে নেই। ৩. কৃষকদের বাধা: অনেক ক্ষেত্রে পর্যটকরা ফসলের ক্ষতি করে বলে স্থানীয় কৃষকরা বাইরের মানুষের আনাগোনা পছন্দ করেন না।

আগামীর সম্ভাবনা: ইকো-টুরিজম

ধাঁধার চরকে কেন্দ্র করে যদি একটি পরিকল্পিত ‘ইকো-টুরিজম’ পার্ক গড়ে তোলা যায়, তবে এটি কাপাসিয়ার অর্থনীতি বদলে দিতে পারে। প্রশাসনের উচিত:

  • চরটিকে অবৈধ দখলমুক্ত করে এর সীমানা নির্ধারণ করা।

  • পর্যটকদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত এবং ওয়াচ টাওয়ার স্থাপন করা।

  • কৃষি কাজ বজায় রেখেই নির্দিষ্ট কিছু এলাকা পর্যটনের জন্য সংরক্ষিত করা।

ধাঁধার চর আমাদের গর্বের সম্পদ। লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীনের স্মৃতিতে হয়তো এটি ছায়া ঢাকা কোনো রহস্যময় জগত ছিল, কিন্তু আজকের দিনে এটি আমাদের অযত্নে অবহেলিত এক ভূখণ্ড। সঠিক তদারকি পেলে এই চরটি আবার তার হারানো জৌলুস ফিরে পেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *