
ইজ্জতপুর রেলওয়ে স্টেশন: শ্রীপুরের হারানো ঐতিহ্য, রহস্যময় জনপদ এবং এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গল্প
প্রিয় গাজীপুর | ১০ মার্চ, ২০২৬
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার বুক চিরে চলে যাওয়া ঢাকা-ময়মনসিংহ রেললাইনের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে একটি স্থবির হয়ে যাওয়া ইতিহাস—ইজ্জতপুর রেলওয়ে স্টেশন। ব্রিটিশ ভারতের স্বপ্ন ও বাণিজ্যের এক সময়ের সফলতম এই স্টেশনটি আজ ঝোপঝাড়ে ঢাকা এক পরিত্যক্ত জনপদ। আধুনিকতার চাকচিক্যে হারিয়ে যাওয়া এই স্টেশনটি কেবল রেলের একটি স্টপেজ নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের যাপিত জীবনের হাজারো স্মৃতির আধার। কেন এই স্টেশনটি আজ ‘ভূতুড়ে’ তকমা পেয়েছে এবং কেনই বা এটি পুনরায় চালুর দাবি জোরালো হচ্ছে, তা নিয়েই আমাদের এই বিস্তারিত প্রতিবেদন।
১৮৮৫: ব্রিটিশ বাণিজ্যের এক মাইলফলক
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, যখন ব্রিটিশরা বাংলা ও আসামের পাট ও কৃষিপণ্য দ্রুত কলকাতায় পাঠানোর পরিকল্পনা করছিল, তখন ১৮৮৫ সালে স্থাপিত হয় ঢাকা স্টেট রেলওয়ে। সেই প্রকল্পেরই অংশ হিসেবে গড়ে তোলা হয় ইজ্জতপুর স্টেশন। পারুলী নদীর কোল ঘেঁষে নির্মিত এই স্টেশনের স্থাপত্যশৈলীতে তৎকালীন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাপ স্পষ্ট। লাল ইটের তৈরি সিগন্যাল রুম এবং চুন-সুরকির গাঁথুনির ভবনগুলো আজও টিকে আছে, যদিও অযত্ন আর অবহেলায় সেগুলো আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এক সময় এই স্টেশনের গুরুত্ব ছিল আজকের জয়দেবপুর বা শ্রীপুর স্টেশনের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি এটি ছিল ভাওয়াল গড়ের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
নামকরণের নেপথ্যে: ইজ্জত আলী সরকারের ইজ্জত
নামকরণের ইতিহাস নিয়ে স্থানীয়দের মুখে শোনা যায় এক চমৎকার কাহিনী। শুরুতে ব্রিটিশরা এর নাম দিয়েছিল ‘পারুলিয়া স্টেশন’, কারণ পার্শ্ববর্তী পারুলী নদীর নাম ছিল সেই সময়ের ভৌগোলিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু স্টেশনটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয় বড় ধরনের দ্বন্দ্ব। একপক্ষ চায় স্থানীয় গ্রামের নাম, অন্যপক্ষ চায় নদীর নাম। সেই জটিল সময়ে এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিত্ব ইজ্জত আলী সরকারের মধ্যস্থতায় বিষয়টি সমাধান পায়। স্থানীয়দের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে ব্রিটিশ প্রশাসন স্টেশনটির নাম রাখে ‘ইজ্জতপুর’। আজ সেই ইজ্জত আলী সরকারের স্মৃতি এই স্টেশনের নামের মধ্যেই অমর হয়ে আছে, যদিও স্টেশনটি নিজেই আজ অস্তিত্ব সংকটে।
সোনালী দিনের কোলাহল ও বাজারের পতন
একটা সময় ছিল যখন ইজ্জতপুর স্টেশনে প্রতিদিন অন্তত ৫টি লোকাল ও মেইল ট্রেন থামত। ভোরবেলা থেকেই প্ল্যাটফর্মে শুরু হতো কৃষকদের ভিড়। শ্রীপুরের টাটকা শাকসবজি, ভাওয়াল গড়ের বনজ পণ্য, আর বিখ্যাত পাটালি গুড়—সবই এই ট্রেনেই যেত ঢাকা ও ময়মনসিংহ শহরে। স্টেশনের পাশে গড়ে ওঠা ছোট বাজারটিতে চা, মুড়ি আর গুড়ের যে জমজমাট ব্যবসা ছিল, তা আজ কেবল স্মৃতি। ২০১৩ সালে জনবল সংকটের অযুহাতে স্টেশনটি বন্ধ করে দেওয়ার সাথে সাথেই এই পুরো এলাকার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। যে প্ল্যাটফর্মে একসময় ২০ হাজার মানুষের পদচারণা ছিল, আজ সেখানে কেবল আগাছা জন্মেছে।
ভূতুড়ে রহস্য: লোকো মাস্টারদের বিভ্রম ও স্থানীয় উপকথা
ইজ্জতপুর স্টেশনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর দিকটি হলো এর ‘ভূতুড়ে’ তকমা। পরিত্যক্ত হওয়ার পর থেকেই স্থানীয়রা সন্ধ্যার পর এখানে আসতে ভয় পান। অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর মতে, জনশূন্য প্ল্যাটফর্মে রাতে ছায়ামূর্তি হাঁটাচলা করতে দেখা যায়। তবে এর চেয়েও রহস্যজনক হলো ট্রেনের চালক বা লোকো মাস্টারদের অভিজ্ঞতা। ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে চলাচলকারী অনেক চালক জানিয়েছেন, স্টেশনের সিগন্যাল বাতিগুলো বিকল থাকা সত্ত্বেও তারা দূর থেকে কোনো কোনো রাতে আলোর ঝিলিক বা ছায়া দেখতে পান। অনেকে একে কেবল ভ্রম বললেও, স্টেশনটির নিস্তব্ধতা এবং ভাঙা জানালার ভেতরে বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ যেকোনো মানুষকে এক অজানা আতঙ্কে ফেলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
মানবিক সংকেত ও অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং
স্টেশনটি বন্ধ হওয়ার পর এখানকার লেভেল ক্রসিংটি হয়ে পড়েছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কোনো গেটম্যান বা আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয়রা নিজেরাই বাঁশ দিয়ে গেট তৈরি করেন। ট্রেন আসার সময় এলাকাবাসীই একে অপরকে সতর্ক করেন। এই “মানুষের তৈরি সিগন্যাল” ব্যবস্থাটিই বলে দেয়, প্রশাসন কতটা উদাসীন। একটি স্টেশনের গুরুত্ব কেবল বাণিজ্যিক নয়, এটি এলাকার মানুষের নিরাপত্তার সাথেও সরাসরি জড়িত। ইজ্জতপুরে এখন প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হতে হয় স্কুলগামী শিশু ও সাধারণ মানুষকে।
ভাওয়াল গড়ের প্রবেশদ্বার ও ভ্রমণপিপাসুদের গন্তব্য
বর্তমানে ইজ্জতপুর স্টেশনটি পরিত্যক্ত হলেও এটি এখন ফটোগ্রাফার এবং ভ্লগারদের জন্য এক স্বর্গরাজ্য। ব্রিটিশ আমলের পরিত্যক্ত সিগন্যাল রুম এবং জঙ্গলঘেরা পরিবেশ এক ধরণের ‘পোস্ট-অ্যাপোক্যালিপটিক’ লুক তৈরি করে। বিশেষ করে পড়ন্ত বিকেলে পারুলী নদীর ব্রিজের ওপর দিয়ে যখন ট্রেন ধোঁয়া উড়িয়ে চলে যায়, তখন সেই দৃশ্যটি ক্যামেরায় বন্দি করার মতো। ভাওয়াল গড়ের একদম সীমানায় অবস্থিত এই স্টেশনটি প্রকৃতির সাথে ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছে।
পুনরুজ্জীবনের দাবি ও প্রত্যাশা
ইজ্জতপুর স্টেশনকে পুনরায় চালু করার জন্য গত এক দশকে স্থানীয়রা বহুবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় এই স্টেশনটিকে আধুনিকায়ন করা সম্ভব। এটি কেবল যাতায়াত সমস্যার সমাধান নয়, বরং গাজীপুরের ইতিহাসের একটি অংশকে রক্ষা করা। প্রিয় গাজীপুর পোর্টাল সবসময় স্থানীয় ঐতিহ্যের পক্ষে সোচ্চার। আমরা আশা করি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের এই কষ্টের কথা বিবেচনায় নিয়ে ইজ্জতপুরে পুনরায় ট্রেনের যাত্রাবিরতি নিশ্চিত করবে।
প্রিয় পাঠক, আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন!
ইজ্জতপুর স্টেশন সম্পর্কে আপনার কোনো বিশেষ স্মৃতি বা কোনো রহস্যময় অভিজ্ঞতা আছে কি? কমেন্ট সেকশনে আমাদের জানান। আপনার এই মতামত কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে আমাদের সাহায্য করবে। গাজীপুরের অদেখা এমন আরও ইতিহাসের সন্ধানে চোখ রাখুন আমাদের পোর্টাল ও ভিডিও চ্যানেলে!