গাজীপুর ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে শুরু হলো ৪ দিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব - প্রিয় গাজীপুর

গাজীপুর ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে শুরু হলো ৪ দিনব্যাপী ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব

বিশেষ সংবাদ

গাজীপুর ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠে ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মহোৎসব: বইপ্রেমীদের আনাগোনা মুখরিত জয়দেবপুরের রাজবাড়ী মাঠ।

প্রতিবেদক: মো: খলিলুর রহমান
মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ০৮:৩০ পিএম

শহরের যান্ত্রিক কোলাহল ছাপিয়ে গাজীপুরের বুক চিরে জেগে থাকা ঐতিহাসিক ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠ এখন এক ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। ফাল্গুনের এই মায়াবী বিকেলে চারদিকে কেবল নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আর উৎসাহী পাঠকদের কলকাকলি। জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় আজ (২৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী ‘ভ্রাম্যমাণ বইমেলা ও সাংস্কৃতিক উৎসব’। একুশের চেতনার যে মশাল বাঙালি হৃদয়ে প্রজ্জ্বলিত থাকে, সেই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে শুরু হওয়া এই আয়োজন এরই মধ্যে গাজীপুরবাসীর প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে।

মেলার সময়সূচি ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • 📌 স্থান: ভাওয়াল রাজবাড়ী মাঠ (জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সংলগ্ন), গাজীপুর সদর।
  • 🗓️ সময়কাল: ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
  • পরিদর্শনের সময়: প্রতিদিন সকাল ১১:০০ টা থেকে বিকেল ৫:৩০ টা পর্যন্ত।
  • 📖 সংগ্রহ: দেশি-বিদেশি দেড় শতাধিক প্রকাশনীর ১০ হাজারেরও বেশি বই।
  • 🎨 সাংস্কৃতিক দিন: ২৬ ফেব্রুয়ারি (চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা)।

উদ্বোধনী আনুষ্ঠানিকতা ও প্রশাসনের অঙ্গীকার

মঙ্গলবার বিকেলে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মেলার উদ্বোধন করেন গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) জনাব মোঃ শাহরিয়ার নজির। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ডিজিটাল আসক্তির এই যুগে বই পড়ার অভ্যাসই পারে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাতে। ভাওয়াল রাজবাড়ীর মতো ঐতিহাসিক একটি স্থানে এ ধরনের মেলা আয়োজনের উদ্দেশ্য হলো মানুষের ঐতিহ্যের সাথে জ্ঞানের মেলবন্ধন ঘটানো।” উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের স্থানীয় প্রতিনিধিরা।

১০ হাজার বইয়ের বিশাল বৈচিত্র্য: কী নেই মেলায়?

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের মেলায় পাঠকদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে ১০ হাজারের বেশি বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রাখা হয়েছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নিজস্ব প্রকাশনার পাশাপাশি দেশের স্বনামধন্য প্রায় দেড় শতাধিক প্রকাশনী সংস্থার বই স্টলগুলোতে সাজানো হয়েছে। শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে সায়েন্স ফিকশন, কমিকস, রূপকথা ও শিক্ষামূলক বইয়ের সমাহার। অন্যদিকে, বড়দের জন্য রয়েছে ইতিহাস, দর্শন, আত্মউন্নয়ন (Self-development), রাজনীতি এবং সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী নিয়ে সমৃদ্ধ সব গ্রন্থ।

বিশেষ করে সৃজনশীল পাঠকদের জন্য বিশ্বসাহিত্যের ক্ল্যাসিক অনুবাদ এবং কবিতার বইয়ের জন্য পৃথক সেকশন রাখা হয়েছে। মেলায় আসা একজন তরুণ পাঠক বলেন, “আমরা যারা গাজীপুরে থাকি, তাদের জন্য ঢাকায় গিয়ে নিয়মিত বই কেনা সম্ভব হয় না। এই ভ্রাম্যমাণ মেলাটি আমাদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।”

সাংস্কৃতিক উৎসব ও শিশুদের মেধা অন্বেষণ

এই আয়োজনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে সাংস্কৃতিক উৎসব। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয়েছে শিশুদের মেধা বিকাশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা। এর মধ্যে রয়েছে চিত্রাঙ্কন ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। শিশু শ্রেণি থেকে শুরু করে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিতে পারবে। জেলা প্রশাসনের সহায়তায় জেলার সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

“বই পড়া মানে শুধু চোখ দিয়ে অক্ষর পড়া নয়, এটি হচ্ছে নিজেকে চেনার এবং পৃথিবীকে জানার জানালা। আমরা চাই প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে বই থাকুক।” – আয়োজক কমিটির একজন সদস্য।

পাঠাভ্যাস সৃষ্টিতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভূমিকা

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সারা দেশে ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগান নিয়ে পাঠাভ্যাস তৈরির কাজ করে যাচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ বইমেলার এই ধারণাটি প্রান্তিক পর্যায়ে বই পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম সফল মডেল। গাজীপুরের এই মেলাটি কেবল কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, এটি একটি সচেতনতা তৈরির মাধ্যম। মেলা প্রাঙ্গণে পাঠকদের জন্য বসার ব্যবস্থা এবং বই নিয়ে আলোচনার পরিবেশ রাখা হয়েছে, যা এক সাংস্কৃতিক আবহের সৃষ্টি করেছে।

নিরাপত্তা ও অন্যান্য ব্যবস্থা

মেলার চার দিনব্যাপী এই আয়োজনে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মেলা প্রাঙ্গণে সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্য স্বেচ্ছাসেবীরা প্রস্তুত রয়েছেন। এছাড়া বই ক্রয়ের ক্ষেত্রেও বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের জন্য বই কেনা আরও সহজসাধ্য হয়। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে শুরু হয়ে মেলা চলবে সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত।

জ্ঞানের মশাল জ্বলে উঠুক ঘরে ঘরে

বসন্তের এই বিকেলে ভাওয়াল রাজবাড়ীর মাঠ যখন বইপ্রেমীদের পদচারণায় ভরে ওঠে, তখন মনে হয় আমাদের সংস্কৃতি আজও কত শক্তিশালী। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা আর স্মার্টফোনের আসক্তি কাটিয়ে এমন একটি আয়োজন গাজীপুরবাসীর জন্য এক নির্মল প্রশান্তি। আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলমান এই মেলা প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে পাঠস্পৃহা জাগিয়ে তুলবে এবং একটি জ্ঞানদীপ্ত সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—এমনটাই প্রত্যাশা সুধীজনদের। যারা এখনও এই উৎসবে শামিল হননি, তারা আজই আপনার প্রিয়জনকে নিয়ে ঘুরে আসুন জ্ঞানের এই মহামিলনমেলায়।

  1. গাজীপুরের সকল আপডেট ও খবর পেতে আমাদের পোর্টালের সাথে থাকুন। গাজীপুর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ফলো করুন প্রিয় গাজীপুর ফেসবুক পেজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *