ভাওয়াল জমিদার বাড়ি বা ভাওয়াল রাজবাড়ী ও জমিদার বংশের ইতিকথা - প্রিয় গাজীপুর

ভাওয়াল জমিদার বাড়ি বা ভাওয়াল রাজবাড়ী ও জমিদার বংশের ইতিকথা

ভাওয়াল জমিদারবাড়ি বা ভাওয়াল রাজবাড়ী ও জমিদার বংশের ইতিকথা

গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে অবস্থিত ভাওয়াল রাজবাড়ী বাংলাদেশের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী। এই জমিদারির ইতিহাস যেমন নাটকীয়, তেমনি এর পতন ও সন্ন্যাসী রাজার মামলা বিশ্বজুড়ে এক সময় তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

ভাওয়াল জমিদার বংশের সূচনা ও বিস্তারঃ
ভাওয়াল জমিদারির আদি মালিক ছিল গাজী বংশ। ১৭০৯ সালে দৌলত গাজী এই এস্টেটের জায়গিরদারি লাভ করেন। সেই সময় সীমানা নিয়ে বিবাদের জেরে ঢাকার নায়েব নাজিমের সাথে তার বিরোধ বাঁধে। এই মামলায় দৌলত গাজীর পক্ষে আইনি লড়াই করেন বিক্রমপুরের কুশধ্বজ চক্রবর্তী। মামলায় জয়লাভ করে খুশি হয়ে দৌলত গাজী কুশধ্বজকে ‘রায়’ উপাধি এবং দেওয়ান পদ প্রদান করেন। দৌলত গাজীর মৃত্যুর পর ১৭৩৮ সালে এক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কুশধ্বজের পুত্র বলরাম রায় সম্পূর্ণ জমিদারি নিজের নামে করে নেন। বলরাম রায়ের উত্তরসূরিদের হাত ধরেই ভাওয়াল এস্টেট বিশাল আকার ধারণ করে। বিশেষ করে গোলক নারায়ণ রায়ের পুত্র কালী নারায়ণ রায় চৌধুরী ব্রিটিশদের প্রতি অনুগত থেকে ১৮৭৮ সালে ‘রাজা’ উপাধি লাভ করেন। এরপর থেকে ভাওয়াল জমিদার পরিবার ‘রাজপরিবার’ হিসেবে মর্যাদা পায়। পরবর্তীকালে রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর আমলে এই জমিদারি পূর্ববঙ্গের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমিদারিতে পরিণত হয়।

ভাওয়াল ভাওয়াল রাজবাড়ীর রাজপ্রাসাদের স্থাপত্যঃ
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে নির্মিত এই রাজপ্রাসাদটি ওয়াশিংটন ডিসির হোয়াইট হাউসের নকশা অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। রাজা কালী নারায়ণ রায় চৌধুরীর আমলে এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। প্রায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মিত এই বিশাল দ্বিতল ভবনে ছোট-বড় ৩৬০টি কক্ষ রয়েছে। ভবনের বিভিন্ন অংশের আলাদা নাম আছে, যেমন— বড় দালান, রাজবিলাস, পুরোনো বাড়ি, নাট মন্দির, হাওয়া মহল ইত্যাদি। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক ভবনটি গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভাওয়াল সন্ন্যাসী রাজার চাঞ্চল্যকর মামলাঃ
ভাওয়াল জমিদারির ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো মেজ কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়কে কেন্দ্র করে ঘটা ঘটনাপ্রবাহ। ১৯০২ সালে দার্জিলিং ভ্রমণে গিয়ে মেজ কুমারের কথিত মৃত্যু হয় এবং সেখানে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এর ১২ বছর পর ১৯২১ সালে ঢাকার বাকল্যান্ড বাঁধে এক জটাধারী সন্ন্যাসীর আবির্ভাব ঘটে, যার চেহারা হুবহু মেজ কুমারের মতো ছিল। মেজ কুমারের বোন জ্যোতির্ময়ী দেবী তাকে ভাই হিসেবে শনাক্ত করেন। এরপর ১৯৩০ সালে তিনি নিজেকে মেজ কুমার দাবি করে জমিদারির এক-তৃতীয়াংশ মালিকানা চেয়ে মামলা করেন। দীর্ঘ বিচারে ১৯৩৬ সালে আদালত রায় দেয় যে, এই সন্ন্যাসীই প্রকৃত মেজ কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়। বিবাদী পক্ষ (রাণী বিভাবতী দেবী) এই রায় চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাইকোর্ট ও লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত যায়। কিন্তু ১৯৪৬ সালে প্রিভি কাউন্সিলও সন্ন্যাসীর পক্ষেই রায় দেয়।
বিচিত্র বিষয় হলো, আইনি লড়াইয়ে চূড়ান্ত জয়ের ঠিক দুই দিন পর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মেজ কুমার মৃত্যুবরণ করেন। ফলে জয়লাভ করেও তিনি রাজার সিংহাসনে বসার সুযোগ পাননি।

জমিদারির সমাপ্তি ও বর্তমান অবস্থাঃ
১৯৫০ সালের ‘রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন’ পাসের মাধ্যমে ১৯৫১ সালে পূর্ববঙ্গে জমিদারি প্রথার বিলুপ্তি ঘটে। তবে আইনি জটিলতার কারণে ভাওয়াল এস্টেটের কিছু সম্পত্তি এখনও সরকারের ভূমি সংস্কার বোর্ডের অধীনে রয়েছে। ভাওয়াল রাজবাড়ী বর্তমানে গাজীপুর জেলা প্রসাসকের কার্যালয় সহ আরো কিছু সরকারি অফিস হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

এককালের প্রতাপশালী ভাওয়াল রাজাদের স্মৃতি বিজড়িত রাজপ্রাসাদ এবং শ্মশানেশ্বরী মন্দির আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভাওয়াল রাজবাড়ীর সামনের বিশাল দিঘি, ফুলের বাগান এবং কারুকার্যময় দালানগুলো দর্শনার্থীদের মনে সেই হারানো রাজকীয় আভিজাত্যের ছবি এঁকে দেয়। আপনি চাইলে দেশের যেকোন স্থান থেকে এই রাজবাড়ী ঘুরে দেখতে পারেন।

ভাওয়াল রাজবাড়ী ভ্রমণঃ
ঐতিহাসিক  ভাওয়াল রাজবাড়ী গাজীপুরের জয়দেবপুরে অবস্থিত। (বর্তমানে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়) ভ্রমণের জন্য ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে সহজেই যাওয়া যায়। গুলিস্তান থেকে প্রভাতী বনশ্রী বা যেকোনো ময়মনসিংহগামী বাসে চান্দনা চৌরাস্তায় নেমে জয়দেবপুরের শিববাড়ী মোড়ে নেমে সহজেই রাজবাড়ী যাওয়া যায়। এছাড়াও দেশের যে স্থানে ট্রেন আছে সেখান থেলে ট্রেনে জয়দেবপুর স্টেশন নেমে রিকশায় বা সিএনজিতে সরাসরি রাজবাড়ী পৌঁছানো যায়। ভাওয়াল রাজবীড়িতে প্রবেশে কোন টিকেড় এর প্রয়োজন হয় না তবে প্রসাসনিং অফিস চলাকালে একটু সাবধানে দর্শনার্থীরা ঘুরেফিরে। তবে প্রসাসনিক রুমগুলোতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ।

তথ্যসুত্রঃ পূর্ববঙ্গের জমিদারবাড়ি (বই), ভাওয়াল রাজবাড়ী  বই সহ অন্যান্য ইতিহাস বই, ইন্টারনেট, দর্শনার্থী, প্রবীণ ব্যাক্তিবর্গ, এবং আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।