
প্রিয় গাজীপুরঃ গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলা এক সমৃদ্ধ ইতিহাসের ধারক। এই উপজেলার নিভৃত পল্লী সুলতানপুরে দাঁড়িয়ে আছে শত বছরের প্রাচীন ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক ‘সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী মসজিদ’। স্থানীয় লোকমুখে যা ‘দরগাপাড়া শাহী জামে মসজিদ’ বা ‘গায়েবী মসজিদ’ নামেও ব্যাপকভাবে পরিচিত। এটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এই জনপদের মানুষের আবেগ, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও জনশ্রুতি
সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী মসজিদের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। এর নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে যেমন মতভেদ আছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মাঝে রয়েছে অনেক অলৌকিক জনশ্রুতি। জনশ্রুতি অনুযায়ী, সুদূর অতীতকালে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে যে ৩৬০ জন আউলিয়া বাংলায় এসেছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শাহ সুলতান। এই অঞ্চলে ইসলামি আদর্শ প্রচারের সময় তিনি এখানে একটি আস্তানা তৈরি করেন। তাঁর নামানুসারেই এই এলাকাটি ‘সুলতানপুর’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
মসজিদটির গায়ে ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দের একটি শিলালিপি পাওয়া গিয়েছিল বলে অনেকের অভিমত, যা একে সুলতানি আমলের নিদর্শন হিসেবে প্রমাণ করার পক্ষে একটি জোরালো যুক্তি। তবে স্থানীয়দের বড় একটি অংশ একে ‘গায়েবী’ মসজিদ মনে করেন। তাঁদের বিশ্বাস, মানুষের হাতে তৈরি নয়, বরং অলৌকিকভাবে মাটি ফুঁড়ে এই মসজিদটি দৃশ্যমান হয়েছিল। যদিও প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে এটি মোঘল স্থাপত্যশৈলীর প্রভাবপুষ্ট বলে মনে করা হয়, তবুও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘অলৌকিকতা’ একে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে।
স্থাপত্যশৈলীর বিবর্তন
অতীতের সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী মসজিদটি ছিল একটি ছোট এক গম্বুজবিশিষ্ট ইটের স্থাপনা। তৎকালীন স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী, মসজিদের দেয়ালগুলো ছিল বেশ পুরু এবং পোড়ামাটির অলংকরণে সমৃদ্ধ। জানালা ও দরজার কারুকাজে ছিল স্থানীয় ঐতিহ্যের ছাপ। সুরকি ও ইটের সমন্বয়ে তৈরি সেই আদি কাঠামোটি আজ আর সশরীরে বিদ্যমান নেই বললেই চলে।
সময়ের প্রবাহে এবং স্থানীয় মুসল্লিদের সংখ্যাবৃদ্ধির ফলে মসজিদটির আদি রূপ বারবার পরিবর্তিত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৮৭ সালের দিকে বড় ধরনের সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। বর্তমানের মসজিদটি একটি বিশাল বহুতল ভবন, যা আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিকায়নের এই ধাবমান স্রোতে মসজিদের মূল ঐতিহাসিক কাঠামো এবং প্রাচীন গম্বুজটি সম্পূর্ণভাবে ঢাকা পড়ে গেছে। যারা পুরনো ঐতিহ্যের সন্ধানে এখানে যান, তারা হয়তো কিছুটা হতাশ হতে পারেন, কিন্তু মসজিদের পবিত্র পরিবেশ এবং এর ইতিহাস তাদের মুগ্ধ করতে বাধ্য।
আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ও মানত
সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী মসজিদের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর আধ্যাত্মিক ভাবগাম্ভীর্য। প্রতি শুক্রবার এবং বিশেষ ধর্মীয় দিনগুলোতে এখানে মুসল্লিদের ঢল নামে। এটি শুধু কাপাসিয়া নয়, বরং গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর মানুষের জন্যও একটি বড় ভরসার জায়গা।
মানুষের অগাধ বিশ্বাস, এই মসজিদে এসে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করলে মনের আশা পূর্ণ হয়। এই বিশ্বাস থেকেই মানুষ এখানে মানত করেন। কেউ হয়তো গরু, খাসি বা নগদ অর্থ দান করেন, আবার কেউবা এতিমখানা বা মাদ্রাসার জন্য অনুদান প্রদান করেন। জুমার দিনগুলোতে এখানে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের মিলনমেলা ঘটে, যা এই অঞ্চলকে একটি প্রাণবন্ত ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত করেছে।
সামাজিক ও জনহিতকর ভূমিকা
মসজিদটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বিশাল জনহিতকর বলয়। মসজিদের সাথেই অবস্থিত ‘সুলতানিয়া দারুস সুন্নাহ হাফিজিয়া এতিমখানা মাদ্রাসা’। মসজিদের আয়ের বড় একটি অংশ এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের থাকা, খাওয়া ও শিক্ষার পেছনে ব্যয় করা হয়। অসহায় ও এতিম শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর এই মহতী উদ্যোগ মসজিদটিকে স্থানীয় সমাজে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। এছাড়া মসজিদের বিশাল আঙিনায় একটি কবরস্থান রয়েছে, যা মৃত ব্যক্তিদের দাফনের জন্য স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত।
পর্যটন ও যাতায়াত ব্যবস্থা
গাজীপুরের পর্যটন মানচিত্রে সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। যারা কাপাসিয়া বা এর আশপাশে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তারা সুলতানপুর গ্রামের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি একনজর দেখার জন্য সময় বের করে নেন। কাপাসিয়া উপজেলা সদর থেকে টোকগামী সিএনজি বা অটোতে চড়ে অনায়াসেই এই মসজিদে যাওয়া যায়। বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদের তীরবর্তী এই এলাকার সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের মনে এক প্রশান্তি এনে দেয়।
বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
বর্তমানে মসজিদটি একটি আধুনিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলেও, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ প্রতিটি জাতির দায়িত্ব। সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী মসজিদের আদি কাঠামোর ধ্বংসাবশেষ বা কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থাকলে তা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি, নতুন প্রজন্মের কাছে এই মসজিদের ইতিহাস তুলে ধরতে বিশেষ প্রদর্শনী বা তথ্যের বোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে।
ভ্রমণ: সুলতানপুর শাহী মসজিদ, কাপাসিয়ায় কিভাবে এবং কখন যাবেন?
আপনি যদি গাজীপুরের এই ঐতিহাসিক স্থানটি ভ্রমণের পরিকল্পনা করে থাকেন, তবে নিচের ধাপগুলো আপনাকে সাহায্য করবে:
উপযুক্ত সময়ঃ বছরের যেকোনো সময় এখানে আসা গেলেও, জুমার দিন বা বার্ষিক মাহফিলের সময় এলে আপনি মসজিদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক আবহ অনুভব করতে পারবেন। শান্ত পরিবেশে ঘুরে দেখতে চাইলে সপ্তাহের সাধারণ দিনগুলো বেছে নিন।
যাত্রা শুরু (যাতায়াত) গাজীপুর চৌরাস্তা বা কাপাসিয়া বাজার থেকে বাস বা সিএনজি যোগে টোক বাজারের দিকে রওনা দিন। সেখান থেকে স্থানীয় অটোরিকশায় সরাসরি সুলতানপুর শাহী মসজিদে পৌঁছানো যায়।
প্রস্তুতির তালিকা যেহেতু এটি একটি পবিত্র ধর্মীয় স্থান, তাই পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে শালীনতা বজায় রাখুন। সাথে ক্যামেরা বা ফোন রাখুন ছবি তোলার জন্য, তবে নামাজের সময় ছবি তোলা থেকে বিরত থাকা উত্তম।
দেখার মতো বিষয় মসজিদটির বর্তমান আধুনিক স্থাপত্যের পাশাপাশি এর পুরোনো ঐতিহ্যের ছাপ খুঁজে দেখার চেষ্টা করুন। পাশের এতিমখানা এবং মাদ্রাসার পরিবেশটিও পর্যটকদের মনে প্রশান্তি জাগায়।
ফিরে আসার আগে মসজিদ প্রাঙ্গণে কিছু সময় বসে স্থানীয়দের সাথে কথা বলতে পারেন। এলাকার মানুষের কাছে এই মসজিদের অলৌকিক বা ঐতিহাসিক জনশ্রুতি সম্পর্কে জানতে পারলে আপনার ভ্রমণ অভিজ্ঞতা আরও সমৃদ্ধ হবে।
সুলতানপুর শাহী মসজিদ কেবল একটি ইমারত নয়, এটি আমাদের শেকড়ের একটি অংশ। যদিও আধুনিকতার স্পর্শে এর বাহ্যিক রূপ বদলে গেছে, তবুও এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা আধ্যাত্মিক শক্তি আজও মানুষকে আকর্ষণ করে। গাজীপুরের ঐতিহ্য ও ইসলামের ইতিহাসকে বুঝতে হলে সুলতানপুর দরগাপাড়া শাহী মসজিদ পরিদর্শনের কোনো বিকল্প নেই।