
কবলধা জমিদার বাড়ি: ইতিহাস, স্থাপত্য ও এক ট্র্যাজিক পরিণতির আখ্যান
বাংলার জমিদার আমলের ইতিহাসের পাতায় আমাদের গাজীপুরের বলধা জমিদার বাড়ি এক অনন্য নাম। যা ‘চৌধুরী বাড়ি’ বাড়ি নামেও পরিচিত। শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই জমিদার বংশ যেমন অমর হয়ে আছে, তেমনি এই পরিবারের শেষ অধ্যায়ের এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আজও মানুষের মনে বিষাদ জাগায়।
বলধা জমিদার বাড়ি এস্টেটের গোড়াপত্তনঃ
বাংলাদেশের (পূর্ববঙ্গ) গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের বলধা গ্রামে এই রাজকীয় বাড়ির অবস্থান। বলধা এস্টেটের গোড়াপত্তন করেছিলেন রাজ কিশোর রায় চৌধুরী। তৎকালীন ঢাকা ও গাজীপুরের বিশাল এলাকা জুড়ে এই জমিদারি বিস্তৃত ছিল। বর্তমান ঢাকার কাফরুল, তেজকুনীপাড়া এমনকি ভাওয়াল রাজবাড়ির সামনের বিশাল মাঠ এবং ওয়ারীর বলধা গার্ডেন ছিল এই জমিদারদেরই সম্পত্তি।
রাজ কিশোর রায় চৌধুরী নিঃসন্তান হওয়ায় তার জমিদারি টিকিয়ে রাখতে তিনি হরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীকে দত্তক নেন। হরেন্দ্র নারায়ণই বলধার মূল প্রাসাদসহ অধিকাংশ স্থাপনা নির্মাণ করেন। তিনতলা বিশিষ্ট এই প্রাসাদে ৪০টি কক্ষ ছিল। বলধা জমিদার বাড়ির সীমানা প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ আজও অতীতের সাক্ষ্য দেয়। বর্তমানে মূল ভবনটি জরাজীর্ণ হলেও এর পাশে একটি দুর্গামন্দির এখনো টিকে আছে।
নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী এক বিদগ্ধ জমিদারঃ
হরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীও নিঃসন্তান ছিলেন, যার ফলে তিনি গাছার জমিদার পুত্র নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীকে (জন্ম: ১৮৮০ সাল) দত্তক নেন। এই নরেন্দ্র নারায়ণই বলধা জমিদার বাড়ি এস্টেটকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি একাধারে ছিলেন নাট্যকার, কবি, গীতিকার এবং প্রকৃতিপ্রেমী। তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে কবিতা লিখতেন। তাঁর জ্ঞানস্পৃহা ছিল অতুলনীয়। তিনি শ্রী হরিনাথ দে-র কাছে ইংরেজি, হাকিম হাবিবুর রহমানের কাছে আরবি ও ফার্সি এবং শরৎ চন্দ্র কাব্য তীর্থের কাছে সংস্কৃত শিক্ষা লাভ করেন।
ঢাকার বলধা গার্ডেন ও মিউজিয়ামের ইতিহাসঃ
নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী কেবল জমিদারি চালনাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং ঢাকার সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষায় অসামান্য অবদান রেখেছেন।
- বলধা গার্ডেন: বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ সংগ্রহের নেশা থেকে তিনি ঢাকার ওয়ারীতে বিখ্যাত ‘বলধা বোটানিক্যাল গার্ডেন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
- কালচার হাউস (বলধা হাউজ): ওয়ারীতে তিনি ‘কালচার’ নামে একটি বাড়ি নির্মাণ করেন যা ‘বলধা হাউজ’ নামে পরিচিত।
ব্যক্তিগত জাদুঘরঃ তিনি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় মুদ্রা, মধ্যযুগের যুদ্ধাস্ত্র ও প্রাচীন পোশাকের এক সমৃদ্ধ সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন। দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার এই সংগ্রহটি অধিগ্রহণ করে এবং বর্তমানে তা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
পারিবারিক কলহ ও মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিঃ
নরেন্দ্র নারায়ণের প্রথম স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর গর্ভে দুই সন্তান ছিল—নৃপেন্দ্র নারায়ণ (খোকা বাবু) এবং সুনীতি বালা। খোকা বাবু ছিলেন ঢাকা কলেজের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। কিন্তু জমিদারের ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে অশান্তির ছায়া। পরিণত বয়সে নরেন্দ্র নারায়ণ সুধাংশু কিরণ নামে এক নারীকে দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এই দ্বিতীয় বিবাহ প্রথম পক্ষের সন্তানদের সঙ্গে এক তীব্র পারিবারিক সংঘাতের সৃষ্টি করে। সুধাংশু কিরণ নিঃসন্তান ছিলেন এবং তিনি নিজের ভাইকে দত্তক নিতে চেয়েছিলেন, যা পরিবারে দ্বন্দ্বে নতুন মাত্রা যোগ করে। এই রেষারেষি শেষ পর্যন্ত এক ভয়াবহ রূপ নেয়।
হত্যাকাণ্ড ও জমিদার বংশের পতনঃ
১৯৪০ সালের জুন মাসে এক অন্ধকার রাতে ঘটে যায় এক বীভৎস ঘটনা। দ্বিতীয় স্ত্রী সুধাংশু কিরণের নির্দেশে তাঁর পাঠানো ‘প্রকাশ’ নামে এক কাজের লোক ঘুমন্ত অবস্থায় জমিদারের একমাত্র পুত্র খোকা বাবুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তে হত্যাকারী প্রকাশের দ্বীপান্তর এবং ষড়যন্ত্রকারী সুধাংশু কিরণের নির্বাসন দণ্ড হয়।
একমাত্র পুত্রের এই অকাল ও নৃশংস মৃত্যু জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। শোকের ছায়া কাটতে না কাটতেই ৩ বছর পর ১৯৪৩ সালে এই মহানুভব জমিদারের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর পর বলধা জমিদারি কাশিমপুর জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় এবং এভাবেই বলধা জমিদার বংশের গৌরবের অবসান ঘটে।
বর্তমান অবস্থাঃ
আজ বলধা জমিদার বাড়ি অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মূল ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়লেও স্থানীয়দের কাছে এটি আজও ‘চৌধুরী বাড়ি’ নামে পরিচিত। বর্তমানে এখানে সরকারি আশ্রয় কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। যদিও ভবনটি জীর্ণ, কিন্তু বলধা গার্ডেন বা জাতীয় জাদুঘরের গ্যালারিতে আজও নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর রুচি ও আভিজাত্যের ছাপ পাওয়া যায়। বাংলার এই ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও ইতিহাসকে সংরক্ষণ করা এখন সময়ের দাবি।
বলধা জমিদার বাড়ি ভ্রমণঃ
গাজীপুরের ঐতিহাসিক বলধা জমিদার বাড়িটি গাজীপুরের বাড়িয়া ইউনিয়ন অবস্থিত। এখানে ভ্রমণের জন্য ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে সহজেই যাওয়া যায়। গুলিস্তান থেকে প্রভাতী বনশ্রী বা যেকোনো ময়মনসিংহগামী বাসে চান্দনা চৌরাস্তায় নেমে জয়দেবপুরের শিববাড়ী মোড়ে নেমে সহজেই বাড়িয়া আসতে আসলেই এটি সহজেই পাওয়া যায়। এছাড়াও দেশের যে স্থানে ট্রেন আছে সেখান থেলে ট্রেনে জয়দেবপুর স্টেশন নেমে রিকশায় বা সিএনজিতে সরাসরি বাড়িয়া বাজারে পৌঁছানো যায়। এরপর এলাকার কাউকে জিজ্ঞাসা করলে এখানে যাওয়া যায়।
তথ্যসুত্রঃ পূর্ববঙ্গের জমিদারবাড়ি (বই), ভাওয়াল রাজবাড়ী বই সহ অন্যান্য ইতিহাস বই, ইন্টারনেট, দর্শনার্থী, প্রবীণ ব্যাক্তিবর্গ, এবং প্রিয় গাজীপুর টিমের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।
আরো জানুনঃ ভাওয়াল রাজবাড়ী
