
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী একটি প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী জনপদ। বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের এই বাজারটি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং লোকজ সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত। বরমীর ঐতিহ্যের প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র (বরমী বাজার)
বরমী বাজারের ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরোনো। এক সময় এটি পাট ও কাঠ ব্যবসার জন্য বিখ্যাত ছিল। বিশাল বিশাল সব গয়না নৌকা নদীর ঘাটে ভিড়ত। আজও বরমী বাজার শ্রীপুর তথা গাজীপুরের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত।
২. শতবর্ষী গরুর হাট
বরমীর অন্যতম বড় ঐতিহ্য হলো এর পশুর হাট। প্রতি বুধবার এখানে বিশাল হাট বসে, যা দেশের অন্যতম প্রাচীন এবং বৃহৎ গরুর হাট হিসেবে পরিচিত। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে গরু-মহিষ, ছাগল, ভেরা কেনাবেচা করতে আসেন।
৩. বরমীর আমসত্ত্ব ও দই
খাবারের দিক থেকেও বরমীর আলাদা সুনাম রয়েছে। বিশেষ করে এখানকার আমসত্ত্ব এবং মিষ্টি বা দই স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া শীতের মৌসুমে বরমীর গুড় এবং পিঠাপুলিরও ঐতিহ্য রয়েছে। আরো রয়েছে তন্দুরি রুটি, যা কেজী হিসেবেও বিক্রি হয় প্রতি বুধবার সপ্তাহিক হাটে। বরমীর বাজারের মিষ্টির দোকানগুলো বেশ পুরোনো। এখানকার ছানা এবং মালাই দেওয়া দই এর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। স্থানীয় গরু থেকে সংগৃহীত খাঁটি দুধ ব্যবহার করার কারণেই এখানকার মিষ্টির স্বাদ ভিন্ন হয়।
৪. লোকজ সংস্কৃতি ও উৎসব
শীতলক্ষ্যার পাড়ে অবস্থিত হওয়ায় এখানে আগে নৌকাবাইচ সহ নানান প্রতিযোগিতার নিয়মিত আয়োজিত হতো। এছাড়া বরমীর বিভিন্ন মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো শ্রীপুরের গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।
৫. নীলকুঠি ও প্রাচীন স্থাপনা
বরমীর আশেপাশে ব্রিটিশ আমলের কিছু নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ এবং পুরোনো জমিদার আমলের স্থাপনা দেখা যায়, পাল বংশের অনেক নিদর্শন এখনো বিদ্যমান। যেমন: বরমী ইউনিয়ন এর সোহাদিয়া গ্রামে এখনো এখটা স্থানকে পালের ভিটা নামে ডাকা হয় যা এলাকাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।
বরমীর কাঠ ও বাঁশের বাজার
শীতলক্ষ্যা নদীর পাড় ধরে বরমীর যে কাঠের বাজার বসে, তা ঐতিহাসিকভাবে বিখ্যাত। ভাওয়াল গড়ের শাল-গজারি কাঠের জন্য বরমী এক সময় প্রধান কেন্দ্র ছিল। আজও গ্রামবাংলার ঘর তৈরির জন্য উন্নত মানের বাঁশ ও কাঠের বিশাল সমাহার এখানে দেখা যায়। প্রতি মঙ্গলবার এখানে বাশের বাজার বসে।
বিশাল পাইকারি ধানের বাজার
বরমী ধান মহল ঢাকা বিভাগের অন্যতম প্রাচীন এবং বড় ধানের আড়ত। এখানকার আড়তদাররা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করেন। প্রতি সপ্তাহে বুধবার বাজারের দিন এখানে কয়েকশ মণ ধান কেনাবেচা হয়, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। যদিও দিন দিন এই আমদানি কমে যাচ্ছে। বরমী ধান মহলে স্থানীয় জাতের পাশাপাশি উন্নত মানের সুগন্ধি চাল (যেমন: কালিজিরা, চিনগুড়) এবং মোটা ধানের বিশাল সংগ্রহ থাকে। বিশেষ করে গাজীপুরের স্থানীয় মাটির ফলন করা ধানের আলাদা কদর এখানে চিরকালই ছিল।
লাল মাটির মিষ্টি কাঁঠাল
বরমী এবং এর আশেপাশের এলাকার (যেমন: তেলিহাটি, কাওরাইদ) মাটি লাল ও উঁচু। এই বিশেষ মাটির কারণে এখানকার কাঁঠাল অত্যন্ত মিষ্টি, রসালো এবং ঘ্রাণে অতুলনীয় হয়। এখানকার কাঁঠালের কোষ বা কোঁয়াগুলো সাধারণত বেশি শক্ত ও লালচে আভাযুক্ত হয়, যা পাইকারদের কাছে খুব জনপ্রিয়। প্রতি বুধবার বরমীর হাটে ধানের পাশাপাশি কাঁঠালের এক বিশাল বাজার বসে। ভোরের আলো ফোটার আগেই শত শত ভ্যান, ঠেলাগাড়ি এবং নৌকা বোঝাই করে কৃষকরা বাগান থেকে কাঁঠাল নিয়ে আসেন। এই হাটে শুধু স্থানীয়রা নয়, ঢাকা, সিলেট এবং চট্টগ্রাম থেকেও বড় বড় পাইকাররা ট্রাক নিয়ে আসেন। প্রতি মঙ্গলবার এবং বুধবার এখানে কাঠালের সিজনে কাঠালের হাট বসে।
বরমীর ঐতিহ্যের কথা বললে বানরের কথা আসবেই। গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বরমী বাজার এবং এর আশেপাশে কয়েকশ বছর ধরে শত শত বানর বসবাস করে আসছে, যা এই অঞ্চলের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। কথিত আছে, ভাওয়াল রাজাদের আমল থেকেই এই বানরগুলো এখানে বসবাস করছে। বরমী বাজারের পুরোনো দালান, মন্দিরের ছাদ এবং বড় বড় গাছের ডালে এদের অবাধ বিচরণ দেখা যায়। স্থানীয় মানুষ এদের কোনো ক্ষতি করে না, বরং বরমীর ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই দেখে। এখানকার বানরগুলো মানুষের খুব কাছাকাছি থাকে। বরমী বাজারে আসা দর্শনার্থীরা এদের বিস্কুট, কলা বা বাদাম খেতে দেন। অনেক সময় দোকানের মালামাল নিয়ে টানাটানি করলেও ব্যবসায়ীরা এদের তাড়িয়ে দেয় না, বরং ভালোবেসে খাবার দেয়।
এক সময় বরমী এবং এর আশেপাশে প্রচুর বন ও ফলের গাছ ছিল। কিন্তু বন কমে যাওয়ায় বর্তমানে এই বানরগুলো পুরোপুরি বাজার এবং মানুষের দেওয়া খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অনেক সময় খাবারের অভাবে এরা লোকালয়ে ঢুকে পড়ে বা মানুষের ঘরবাড়ি থেকে খাবার নিয়ে যায়।
বরমী বাজারে যারা ঘুরতে আসেন, তাদের জন্য প্রধান আকর্ষণ থাকে এই বানরগুলো। বিশেষ করে বরমী বাজার জামে মসজিদের আশেপাশের এলাকা এবং শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে এদের দলবদ্ধভাবে খেলা করতে দেখা যায়।
সংক্ষেপে- বরমীর মূল পরিচয় তার ব্যবসা-বাণিজ্য, শীতলক্ষ্যা নদী এবং বিশাল পশুর হাটের মাধ্যমে। এটি একটি ঐতিহ্যবাহী গঞ্জ বা নদী-বন্দর। এক সময় এটি এশিয়া মহাদেশর সবচেয়ে বড় গ্রাম্য বাজার হিসেবে পরিচিত ছিল। বরমী সম্পর্কে আরো কিছু জানাত থাকলে মন্তব্য ঘরে লিখে জানান।
